জাতির পিতার সমবায় ভাবনা ও কৃষি নীতি ২০১৮

জাতির পিতার সমবায় ভাবনা ও কৃষি নীতি ২০১৮

জাতির পিতার সমবায় ভাবনা ও কৃষি নীতি ২০১৮

প্রফেসর এম কামরুজ্জামান : কৃষি উন্নয়নে সমবায় পদ্ধতি যুগান্তকারী অবদান রাখতে পারে। কৃষকরা সমবায়ী হলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মনোবলও বৃদ্ধি পাবে। একতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হলে কৃষক সমাজ আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। সমবায়ের মূলকথা হচ্ছে একতাই বল। নিজের পৃথক অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে অপরের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার নামই একতা। একতাবদ্ধ থাকলে শক্তি বৃদ্ধি পায়, মনে সাহস সৃষ্টি হয় এবং জীবনের সাফল্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। জাতীয় সংহতি বা একতা জাতিকে শক্তিশালী করে তোলে, উন্নতি ও সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যায়। সভ্যতার অগ্রগতির পেছনেও কাজ করছে একতাবোধ। তাই ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই প্রবাদ বাক্যে একতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে। একতার মাঝেই জাতি তথা বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সমবায়ের মূলনীতিসমূহ স্মরণ করা যেতে পারে : ১. অবাধ ও স্বতঃপ্রবৃত্ত সদস্যপদ, ২. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, ৩. সমিতির তহবিলে সদস্যদের অংশগ্রহণের পরিমাণ যাই হোক না কেন, তাদের সবারই অধিকার সমান থাকবে, ৪. উদ্বৃত্ত অংশে সব সদস্যেরই অধিকার থাকবে, ৫. সমিতির সদস্যগণকে নিয়মিতভাবে সমবায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা, ৬. সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতার স্পৃহা জাগরূক রাখা।

বাংলাদেশের প্রায় সব পেশার লোকদের সমিতি বা সংঘ রয়েছে। অথচ কৃষকদের মধ্যে সংঘ বা সমিতি চেতনা এখনো খুবই কম। সমবায় খামার গড়ে তোলার প্রবণতা ও মানসিকতার অভাবের কারণে কৃষির অধিকতর আধুনিকায়ন ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণের কাংখিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে বাংলাদেশের কৃষকের মাত্র ১.৩৪% ভাগ কৃষক সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ মূল্যে ধান বিক্রয় করতে পারে। বিগত বোরো মৌসুমের উপর পরিচালিত এক গবেষনায় বলা হয়েছে বাংলাদেশের যেহেতু প্রায় ৮৪% হচ্ছে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক সেহেতু তাদের মূলধন খুবই কম থাকে আর কৃষিতে যতই আধুনিকতার ছোয়া লাগছে কৃষকের জন্য কৃষি কাজ ততই ব্যয়বহুল হচ্ছে, শ্রম নির্ভর কৃষি থেকে মূলধন নির্ভর কৃষিতে রুপান্তর হচ্ছে যদিও উৎপাদনশীলতাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলশ্রুতে দেশের সিংহভাগ কৃষকই দারুনভাবে মূলধন সংকটে ভুগছে। বর্তমান সরকার কতৃক এই মুলধন সংকট লাঘবের জন্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে কৃষক খুব বেশী লাভবান হচ্ছে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই মুলধন সংকট থেকে উত্তরণের একটি কায©কর উপায় হতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার প্রবর্তন।

কৃষকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলার জন্য সমবায় ভিত্তিক যৌথ খামার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা দরকার। সমবায়ের নীতি অনুসারে যার জমি তারই থাকবে, কেবল সকলে একত্রে কাজ করবে ও উৎপাদিত ফসল প্রত্যেকের জমি অনুপাতে ভাগ করে নেবে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে ভূমির খন্ডবিখন্ডতা হ্রাস পাবে এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

ভারতে ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ ডেইরি ফেডারেশন অভ ইন্ডিয়া লি. সমবায়ের একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ফেডারেশনের ২৯.৭২ কোটি মার্কিন ডলার লেনদেন হয়েছে। ১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরু করে ২৭টি রাজ্য, ২১৮ টি জেলা দুগ্ধ ইউনিয়ন, ১ লক্ষ ৭৭ হাজার গ্রাম দুগ্ধ সমিতি, ১ কোটি ৬৩ লক্ষ দুগ্ধ খামারিদের নিয়ে এই ডেইরি ফেডারেশন বর্তমানে কায©ক্রম পরিচালনা করছে। এই ফেডারেশন বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘি, পনীর, মাখন, দুগ্ধ, হে পাউডার, গুড়োদুধ, টেট্রাপেকে দুগ্ধ বাজারজাতকরণ করে যাচ্ছে। এছাড়াও জাতের উন্নয়ন, আরটিফিসিয়াল ইনসিমিনেশন, বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই ফেডারেশন দুগ্ধ খামারিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

জাপানের জেন-নোহ হচ্ছে কৃষি সমবায় সমিতিসমূহের একটি ফেডারেশন। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে সারাদেশে ৯৪৫টি সমবায় ইউনিয়নের মাধ্যমে পরিচালিত এই ফেডারেশনের বর্তমান মূলধনের পরিমান ১০৮ কোটি মার্কিন ডলার এবং বার্ষিক টার্নওভারের পরিমান ৪৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। জেন-নোহ’র ব্যবসাসমূহের মধ্যে রয়েছে চালসহ দানাশস্য উৎপাদন, টাটকা ফলমুল ও শাকসব্জি উৎপাদন, কৃষি ব্যবসা কায©ক্রম, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, প্রাণিসম্পদ উৎপাদন কায©ক্রম, ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও গুনগতমানসম্পন্ন দ্রব্যাদি সরবরাহ, কৃষিজাত পণ্য রপ্তানী কাযক্রম ইত্যাদি। উপরন্তু জেন-নোহ’র রয়েছে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র যার মাধ্যমে নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য ব্যবহার করে নিরাপদ ও গুনগতমানসম্পন্ন খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন ও সরবরাহ, সার ব্যবহারের অপচয় রোধকল্পে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাংখিত মাত্রায় সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা, নতুন নতুন এগ্রোক্যামিক্যালস উৎপাদন ও পরিবেশ সম্মত ব্যবহার নিশ্চিতকরন, উদ্যানতাত্বিক দ্রব্যের গুনগতমান নিশ্চিতকরে প্যাকেজিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ, কৃষি যন্ত্রপাতির রক্ষনাবেক্ষন ও মেরামতের জন্য ওযার্কশপ স্থাপন। এছাড়াও ফিড এন্ড লাইভস্টক এর কেন্দ্রীয় গবেষণা ইনস্টিটিউট, অ্যানিম্যাল হেলথ ইনস্টিটিউট, এমব্রায়ো ট্রান্সফার সেন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উন্নয়নেও জেন-নোহ তথা জাপান এগ্রিকালচার সমবায়ের মাধ্যমে সফলতার সাথে কায©ক্রম পরিচালনা করে চলেছে। জাপান সমবায় বর্তমানে ৩৬০০০ সমবায় সংগঠন, ৮০ মিলিয়ন সদস্য এবং ৬ লক্ষ ৪০ হাজার কর্মচারির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।     

ওয়ার্ল্ড কো-অপারেটিভ মনিটর এর তথ্য মতে প্রায় ৩ মিলিয়ন সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ১২% মানুষ সমবায়ের সাথে সংযুক্ত রয়েছেন। বিশ্বের কর্মরত জনসংখ্যার প্রায় ১০% জনসংখ্যার সমবায়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর মাঝে শীর্ষ ৩০০ কো-অপারেটিভ সোসাইটির বার্ষিক টার্নওভারের পরিমান ২০৩৪.৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।  সমবায়ের সকল খাত মিলিয়ে শীর্ষ ৩০০ সমবায় সমিতির মাঝে কৃষি সমবায় সমিতির অবদান হচ্ছে ৩১.৭%।  এপ্রেক্ষিতে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে সমবায় সমিতির মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী কৃষকগণ সংগঠিত হচ্ছেন, উৎপাদন এবং বিপণন কায©ক্রম পরিচালনা করছে।

টেকসই উন্নয়ন এর ৮ নং অভীষ্ট হচ্ছে সকলের জন্য পূর্নাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। সমবায়ের মাধ্যমেই এই অভীষ্ট দক্ষতার সাথে অর্জন করা সম্ভব। উপরন্তু এই অভীষ্টের সাথে ১ নং অভীষ্ট সর্বত্র সবধরণের দারিদ্রের অবসান, ২ নং অভীষ্ট ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার, ৫ নং অভীষ্ট জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন, ১০ নং অভীষ্ট অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় অসমতা কমিয়ে আনা, ১২ নং অভীষ্ট পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদনধরন নিশ্চিত করা ইত্যাদির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। সুতরাং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করতে হলে সমবায়কে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা অতীব জরুরী।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের ১৩(খ) অনুচ্ছেদে সম্পদের মালিকানার অন্যতম খাত হিসেবে সমবায়কে স্বীকৃতি দেয়া হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধুমাত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই সমবায়কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং শোষিত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সমতা ভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের আওতায় সমবায়কে অন্যতম কৌশলিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

সমবায়ের এ অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার সামনে বলেছেন ‘নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না যে জমি নিয়ে যাব তা নয়। পাঁচ বছরের প্ল্যান- এ বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে একটি কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে কো-অপারেটিভ– এ জমির মালিকের জমি থাকবে। এগুলি বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে। ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল টাউটদেরকে বিদায় দেয়া হবে তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে যে, পাঁচ-বছরের প্লানে প্রত্যেকটি গ্রামে পাঁচশত থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত নিয়ে কম্পালসারী কো-অপারেটিভ হবে। আপনার জমির ফসল আপনি নেবেন, অংশ যাবে কো-অপারেটিভের হাতে, অংশ যাবে গভর্নমেণ্টের হাতে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমবায় সম্পর্কে যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সমবায় কায©ক্রম পরিচালনা করা আবশ্যক।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কতৃ©ক গ্রামাঞ্চলের বাধ্যতামুলক উৎপাদনমুখী সমবায়ের কথা উল্লেখ্ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২ নভেম্বর ২০১৯ সমবায় দিবসে বলেছেন যে, সমবায়ের সদস্যবৃন্দ যে সব পণ্য উৎপাদন করছে সেগুলো শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারে তাহলে গ্রাম বাংলা আর অবহেলিত থাকবে না। দেশের কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সমবায়ের যোগসূত্র স্থাপন করা গেলে কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। চাষোপযোগী কোনো জমি অনাবাদি থাকবে না। দেশের উন্নয়নে যুব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাটি, জল, বায়ু ও পরিবেশের সমন্বয়ে সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই। সমবায়ের মূল চেতনা হলো সম্মিলিত উদ্যোগ। একার পক্ষে যে কাজ করা সম্ভব নয় তা সম্মিলিত উদ্যোগে সহজে করা যায়।

এ প্রসঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চের ভাষণ পুনরায় স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেছিলেন ‘আমার যুবক ভাইরা, আমি যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে এর উপর বাংলার মানুষের বাঁচা নির্ভর করবে। আপনাদের ফুলপ্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পাজামা ছেড়ে একটু লুঙ্গি পরতে হবে। আর গ্রামে গ্রামে যেয়ে এই কো-অপারেটিভকে সাকসেসফুল করার জন্য কাজ করতে হবে। যুবক চাই, ছাত্র চাই সকলকে চাই।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন সমবায় হলো একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র, উৎপাদন, সুশাসন, আন্দোলন, চেতনা ও আদর্শ এবং ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ তার প্রমাণ। জাতির পিতার সেই আদর্শকে ধারণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ২০১৮ সালে প্রণীত কৃষি নীতিতে কৃষি সমবায় ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সেই আলোকে কৃষি নীতি ২০১৮ এর ১৬ অনুচ্ছেদে কৃষি সমবায়কে গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৬.১ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘ভূমির মালিকানা অক্ষুন্ন রেখে প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র উৎপাদনকারী ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে স্বপ্রণোদিত সমবায় বা গ্রুপভিত্তিক কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহ ও সহযোগীতা প্রদান করা’। ১৬.৪ উপ-অনুচ্ছেদে সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে বলা হয়েছে ‘কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে সমবায়ভিত্তিক বিপণনকে সহযোগীতা ও উৎসাহ প্রদান করা’। এক্ষেত্রে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে পূনর্গঠন করে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কৃষি অর্থনীতিবীদদের সম্পৃক্ত করে কৃষি বিপণন ও কৃষি সমবায় অধিদপ্তরে রুপান্তর করা হলে কাংখিত লক্ষ্য অর্জন সহজতর হবে।  ১৬.৭ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘কোন জমি পতিত বা অনাবাদি না রেখে অনিবাসি ও অনুপস্থিত জমির মালিকদের কৃষি উপযোগী জমি সমবায় ব্যবস্থায় চাষের আওতায় এনে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার জাতকরণে উদ্বুদ্ধ করা এবং সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য হতে অর্জিত লভ্যাংশ জমির মালিক, কৃষি শ্রমিক ও সমবায়ের মধ্যে যৌক্তিক হারে বিভাজনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকলের স্বার্থ সংরক্ষণ করা।’ এপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা’র ১৩ এপ্রিল ২০২০ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণের অংশবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন ‘এই দুঃসময়ে আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা শুধু সচল রাখা নয়, আরও জোরদার করতে হবে। সামনের দিনগুলিতে যাতে কোন প্রকার খাদ্য সঙ্কট না হয়, সেজন্য আমাদের একখন্ড জমিও ফেলে রাখা চলবে না।’  এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষি সমবায় ব্যবস্থা কায©কর করা হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সহজতর হবে। এছাড়া, বিদ্যমান সমবায় আইনকে যুগোপযোগী করে কৃষি সমবায়কে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করে সমবায় অধিদপ্তর ও সমবায় ব্যাংককে যদি কার্যকর করা যায় এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞান ব্যবহার করে সমবায়ের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনারবাংলা বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়ন অভিযাত্রা স্বার্থক হবে সফল হবে।

লেখকঃ অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

পাঠকের মন্তব্য