সরকারি দপ্তরগুলোর অনেক ড্রাইভারই ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন 

সরকারি দপ্তরগুলোর অনেক ড্রাইভারই ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন 

সরকারি দপ্তরগুলোর অনেক ড্রাইভারই ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার আবদুল মালেক এখন সারা দেশের মানুষের আলোচনার খোরাক। এখন পর্যন্ত ঢাকায় যার বাড়ি পাওয়া গেছে সাতটি। রয়েছে বাবার নামে মাজার, ছেলের নামে দুগ্ধখামার। অষ্টম শ্রেণি পাস ড্রাইভার মালেক বিপুল বিত্ত-বৈভবের গল্পই যেনো আজ অনেকের সরকারি দপ্তরে গাড়িচালকের চাকরি নেয়ার জন্য হয়েছে উৎসাহের কারণ।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, প্রকৃতপক্ষে মালেকের কত সম্পদ রয়েছে— তা আরও তদন্ত করতে হবে। তদন্তে হয়তো জানা যাবে তার কী পরিমাণ সম্পদ এখনো আড়ালে রয়ে গেছে। তবে মালেক একা নন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেক ড্রাইভারই ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। এসব চালক বিত্তশালী বলেই ধারণা করছে গোয়েন্দা সংস্থা। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এখন ড্রাইভার-পিয়নদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করছে। এই সকল অনুসন্ধানে পাওয়া যাচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা গেছে, সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের চাকরিই যেনো আলাদীনের চেরাগ। এ ড্রাইভাররা তাদের কর্তাদের দুর্নীতির সুযোগে নিজেরা বেশুমার দুর্নীতি করে ফুলে-ফেঁপে উঠছেন।

এদের ঢাকা শহরে বাড়ি রয়েছে, অঢেল সম্পত্তি রয়েছে, গ্রামের বাড়িতে জমি রয়েছে। গ্রামে এদের যে সমস্ত বাড়িঘর রয়েছে, সেগুলো দেখলে চমকে উঠতে হয়। এমন ১০টি প্রতিষ্ঠানকে গোয়েন্দা সংস্থা চিহ্নিত করেছে বলে জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে।

তার মধ্যে— হিসাবরক্ষণ বিভাগ— হিসাবরক্ষণ বিভাগে বা এজি অফিসে যেকোনো সরকারি চেক তোলা হয়। চেক তোলার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ঘুষের লেনদেন হয়ে থাকে।

যে ঘুষের পরিমাণ চেকের পরিমাণের ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠা-নামা করে। আর হিসাবরক্ষণ বিভাগের একাধিক ড্রাইভার বিশাল বিত্তশালী। ঢাকায় তাদের বাড়ি আছে, বিলাসবহুল জীবন-যাপন করেন বলেও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

তিতাস গ্যাস— সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের আরেকটি। যেখানে বড় কর্তাদের দুর্নীতির সুযোগ নেন ড্রাইভাররা। তারাও ফুলে-ফেঁপে উঠেন। তবে তিতাস গ্যাসে শুধু ড্রাইভার নন, অন্যান্য নিম্ন পদের কর্মচারীরাও অনেক বিত্তশালী। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের বাড়িঘর ও সম্পদ রয়েছে বলে প্রাথমিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জানা গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ— বিদ্যুৎ বিভাগের ড্রাইভার, মিটার রিডাররা অনেক ধনী এবং তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের কথা সবাই জানে। এ ড্রাইভাররাও বড় কর্তাদের দুর্নীতির সুযোগে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।

কাস্টমস— সরকারের আরেকটি দুর্নীতিযুক্ত খাত। কাস্টমসে যে ড্রাইভাররা কাজ করেন, তারাও অনেক বিত্তশালী। এই খাতে অসংখ্য ড্রাইভারেরই বিপুল সম্পদের খবর পাওয়া যায়।

রাজউক ও গণপূর্ত— রাজউক ও গণপূর্ত সরকারের আরেকটি দুর্নীতি-আক্রান্ত খাত। রাজউক এবং গণপূর্তে যারা ড্রাইভারের চাকরি করেন, তাদের অনেকেরই বিপুল সম্পদ এবং বাড়িঘরের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজউকে ভুয়া জমি, প্লট, বাড়ি ইত্যাদি লেনদেনের ক্ষেত্রে যে বিপুল দুর্নীতি হয়, তার ভাগ ড্রাইভারও পেয়ে থাকেন বলে জানা যায়।

এলজিইডি— স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগ আরেকটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত, যেখানে ড্রাইভারদের বিপুল সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের একাধিক ড্রাইভারের ঢাকায় আলিশান বাড়ি রয়েছে এবং বিপুল সম্পদও রয়েছে।

সড়ক ও পরিবহন— সড়ক ও পরিবহন খাতের ড্রাইভাররাও অনেক বিত্তশালী। তাদেরও অনেকেরই ঢাকায় বাড়ি আছে। গ্রামের বাড়িতে তাদের রয়েছে জমিজমাসহ অনেক সম্পত্তি। বিআরটিএ— বিআরটিএর ড্রাইভাররাও দুর্নীতিগ্রস্ত।

এখানকার ড্রাইভার ও নিম্ন পদের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পত্তি থাকার কথা আলোচনায় শোনা যায়। বিশেষ করে এখানে নানা রকম অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে বড় কর্তারা যখন আর্থিকভাবে লাভবান হন, তখন ড্রাইভাররাও তার সুযোগ নেন।

ভূমি— ভূমি খাতেও যারা ড্রাইভার রয়েছে তাদের বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। একসময় ভূমির কুতুবকে নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হতো। তবে এখন শুধু এক কুতুব নন, ভূমির অনেক ড্রাইভার ও নিম্ন পদের কর্মচারীই যেনো আলাদীনের চেরাগ পেয়েছেন।

বন বিভাগ— আরেকটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো বন বিভাগ, যেখানকার ড্রাইভার এবং নিম্নপদের কর্মজীবীরা অনেক বিত্তবান।

জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো যত দুর্নীতিগ্রস্ত, সেই প্রতিষ্ঠানের ড্রাইভাররাও তত বিত্তশালী। অর্থাৎ বড় কর্তারা যখন দুর্নীতি করেন তখন ড্রাইভাররাও দুর্বিনীত হয়ে উঠেন। তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কাজেই উপরের দুর্নীতি বন্ধ না করলে, ড্রাইভারদের অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়া বন্ধ করা যাবে না— বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।  

পাঠকের মন্তব্য