সামাজিক মুল্যবোধের এই অবক্ষয় যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে

সামাজিক মুল্যবোধের এই অবক্ষয় যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে

সামাজিক মুল্যবোধের এই অবক্ষয় যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে

ড. আতিউর রহমান : করোনাকালে জেকে বসা অর্থনৈতিক মন্দা ধীরে ধীরে কাটিয়ে  উঠছে বাংলাদেশ। অভাব অনটনে জর্জরিত দিশেহারা মানুষ যখন খানিকটা আশাবাদি হয়ে হয়ে উঠছে, ঠিক সে সময়েই একের পর ধর্ষণসহ নানামাত্রিক নারী নির্যাতনের ঘটনা একের পর এক  সামাজিক ও গণমাধ্যমে আসতে থাকায় মনটাই ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ তথা শক্তি  কি সত্যিই তলানিতে ঠেকেছে? সম্মিলিতভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার যে লড়াকু মন বা ঐতিহ্য নিয়ে এদ্দিন গর্ব করে আসছিলাম তা কি আমরা সত্যি সত্যি  হারাতে বসেছি? ন্যাক্কারজনক এ পরিস্থিতি আমাদের সকলের জন্য হতাশাজনক- সন্দেহ নেই। তবে হতাশায় পর্যবসিত হয়ে চুপচাপ বসে না থেকে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগি হওয়াটাই সময়ের দাবি। সেটিই হবে প্রকৃত সামাজিক দায়বোধের প্রকাশ। এক্ষেত্রে শিক্ষিত তরুণরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

সঙ্গত কারণেই হয়তো এতোদিন শিক্ষার সংখ্যাবাচক দিকগুলোতে আমরা বেশি মনোযোগ দিয়েছি।গুণগত দিক নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাই হয়তো তরুণদের মধ্যে মূল্যবোধের চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা সেভাবে সম্ভব হয়নি। পরিবারও কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান। শিক্ষালয় তো আছেই। সমাজও বড় প্রতিষ্ঠান। এখন সময় এসেছে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন দক্ষ মানব সম্পদ হয়ে ওঠার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবেও বেড়ে ওঠে সে দিকে আরও মনোযোগ দেবার। তাছাড়া, এটা মানতেই হবে যে, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি যে গতিতে এগিয়েছে আমাদের সামাজিক বিকাশ সে গতিতে হয়নি। ফলে প্রযুক্তির অপব্যবহার অনেক সময় মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাই পারিবারিক ও সামাজিক সংযোগ ব্যহত হচ্ছে। আর এর ফল হচ্ছে ভয়াবহ। দ্রুত এবং ক্রমবিকাশমান প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য নতুন করে ভাবতে হবে সকলকেই। 

একইসঙ্গে, আমাদের সন্তানদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার পুরো দায় এককভাবে রাষ্ট্রের নয়, এক্ষেত্রে সমাজের পরিপূরক ভূমিকাটির দিকে আমাদের ভালোভাবে নজর দিতে হবে। আজকের শিশুরা যেন ভালো-মন্দ আর ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য সঠিক ভাবে বুঝতে পারে সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দেবার প্রয়োজন রয়েছে। কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের মধ্যে এ বিষয়টি শেখানো সম্ভব নয়। বরং তারা যেন যাপিত জীবন থেকেও সে শিক্ষাটিই পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। সেখানেই পরিবারের এবং সমাজের দায় এসে যায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরের মতোই নিপীড়কদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে আছেন। পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই নিপীড়ন-বিরোধী জনবান্ধব ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড় করানোর প্রক্রিয়াতে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা এই বার্তাগুলো বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। সকলে মিলে সততা, সাহস ও সহমর্মিতার সাথে চেষ্টা করলেই কেবল আমরা নারীর ওপর নিপীড়নমুক্ত এবং সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ একটি দেশ গড়ে তুলতে পারবো। সে জন্য সমাজে ন্যায় নীতি ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসনকেও এর দায় নিতে হবে। পুঁজিপতিদেরও সামাজিক দায়বদ্ধ থাকতে হবে। সমাজ, রাষ্ট্র এবং বাজারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই আমাদের এগুতে হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

পাঠকের মন্তব্য