শ্লীলতাহানির শিকার হলে সংকোচ নয়

শ্লীলতাহানির শিকার হলে সংকোচ নয়

শ্লীলতাহানির শিকার হলে সংকোচ নয়

ফারহানাহ সানজিদাহ : শ্লীলতাহানি কিংবা সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট একবিংশ শতাব্দীতে এসে যেন ডাল-ভাতের মতো পরিচিত হয়ে গেছে। সমাজের ছোট থেকে বড় কোনো বয়সভেদে যেন এই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট থেমে নেই। রাস্তা-ঘাট, অফিস, বাসা প্রতিটি জায়গাতেই আজ মেয়েরা শালীনতাহানির শিকার হচ্ছে। এক জরিপে দেখা যায় নারীদের ৮০ শতাংশই এর শিকার। এদের মধ্যে ১৭-৩০ বছরের নারীর সংখ্যাই বেশি। যারা পথে-ঘাটে, যানবাহনে যাতায়াতের সময় এবং তাদের কর্মস্থলে শিকার হচ্ছে।
 
দেখা যায়, অধিকাংশ মেয়ে ঘটনাগুলো এড়িয়ে যায়। কিছু সময় তাদের ভয়ভীতি দেখিয়েও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। আবার, অনেক সময় মেয়েরা মনে করে, আইনে হয়তো এর তেমন কোনো প্রতিকার নেই। সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত পথে-ঘাটে, যানবাহনে যাতায়াতের সময় এবং তাদের কর্মস্থলে এর শিকার হতে হতে, মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

সর্বোপরি, সামাজিক এ চরম অবক্ষয়ের শিকার থেকে নিজেকে বাঁচাতে একদিকে প্রয়োজন ব্যক্তি সাহসের, অন্যদিকে প্রয়োজন প্রতিকারস্বরূপ ধারণার। বাংলাদেশের আইন এ বিষয়ে কতটা সহায়তা প্রদান করছে। সুনাগরিক হিসেবে যেমন আইন মেনে চলাটা আমাদের দায়িত্ব, তেমনই তা জেনে দেশের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের আইনি প্রক্রিয়ায় এনে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করাও আমাদের কর্তব্য।

দণ্ডবিধি ১৮৬০, ধারা ৫০৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে শ্লীলতাহানিমূলক কোনো কথা, অঙ্গভঙ্গি কিংবা গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করে, তবে উক্ত ব্যক্তি শাস্তিস্বরূপ সর্বোচ্চ ১ বছরের বিনাশশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দণ্ডবিধিরই, ৩৫৪ ধারাতে বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে কোনো স্ত্রীলোকের ওপর আক্রমণ কিংবা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, তবে উক্ত ব্যক্তির শাস্তিস্বরূপ সর্বোচ্চ ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, ধারা ১০ অনুযায়ী, যৌনপীড়নের জন্য অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে ও দণ্ডিত হবেন। সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য আমরা আইনের প্রতিকারগুলোর সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচিত হলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশের কোনো কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তা যদি শ্লীলতাহানি করে বা করার চেষ্টা করে তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনে এর যে প্রতিকার রয়েছে, তা সম্পর্কে ততটা পরিচিত নই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ধারা ৭৪ এবং ৭৬-এ রয়েছে এ সম্পর্কিত প্রতিকার।

ধারা ৭৬-এ বলা আছে, কোনো পুলিশ কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তা রাস্তা-ঘাটে, বদ্ধ জায়গায়, কর্মস্থলে ইত্যাদি স্থলে যদি শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করে বা করে তবে, শাস্তিস্বরূপ সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সমাজের প্রতি স্তরের মানুষকে হয়তো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কিন্তু এ ধরনের সমস্যা থেকে প্রতিকার পেতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার বিকল্পও নেই। তাই শ্লীলতাহানির শিকার হলে সংকোচ না করে আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে।

ফারহানাহ সানজিদাহ, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

পাঠকের মন্তব্য