করোনায় মানবতার সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পিজিএস 

করোনায় মানবতার সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পিজিএস 

করোনায় মানবতার সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পিজিএস 

মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ঝর্ণা চৌধুরী ও পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ (পিজিএস) এর সদস্যরা দেখলেন প্রায় সবাই বিষয়টা নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কিত। কিন্ত বেশীরভাগ মানুষই জানেনা কিভাবে করোনা মহামারী থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা যায়। আবার অনেকেই অসচেতনভাবে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন শহর থেকে গ্রাম সব জাযগায়। এরকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন মানুষকে সচেতন করতে মাঠে নামবেন। মানুষকে সচেতন করার কাজ করতে গিয়ে তারা উপলব্ধি  করলেন, বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসে দেশের মানুষ গৃহবন্দি থাকার কারণে কর্ম হারিয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষজন খুব অসহায়  দিনযাপন করছেন।এদিকে সুদূর আমেরিকায় বসে পিজিএস এর কর্ণধার জয়তূর্য চৌধুরী ভাবছিলেন ঘরবন্দি মানুষের জন্য কিছু করার।শুরু হলো সচেতন করার পাশাপাশি মানুষকে সাহায্য করার লড়াই। "পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ" একটি  অসাম্প্রদায়িক, অরাজনৈতিক ও অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন। জয়তূর্য চৌধুরীর হাত ধরে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি কাজ করছে বাংলাদেশের পনেরোটি জেলায়। এর প্রধান সমন্বয়ক ঝর্ণা চৌধুরী। আছে দ্বীপান্বিতা, অপরাজিতা এবং সূর্যশিখা নামে এর তিনটি সহযোগী সংগঠন।স্বাবলম্বী শত পরিবার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি , ট্রাফিক  সচেতনতা কর্মসূচি নামে আছে আরও তিনটি প্রকল্প। এসব নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল-

জন সচেতনতা : এ বিষয়ে ঝর্ণা চৌধুরী বলেন, আমাদের ভাবনাজুড়ে ছিলো মানুষকে সচেতন করা। সেই ভাবনা থেকেই দেশের পনেরোটি শাখায় কাজ শুরু করে পিজিএস।সচেতনতার কাজ শুরু হয় সিলেট থেকে। কাজের সুবিধার কথা ভেবে তারা সিলেট শহরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কাজ শুরু করেন।নশুরুতে কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ শুরু করলেও নিজেদের সংগঠিত করতে খুব একটা বিলম্ব হয়নি। তারা নির্দিষ্ট এলাকায় গিয়ে চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া মানুষজন ,পথচারী, রিকশাচালক, সিএনজি চালকসহ বিভিন্ন পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের  সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে থাকেন। মানুষদের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেরা সুরক্ষিত পোষাক পড়ে যানবাহনে জীবাণুনাশক ছিটানো শুরু করেন।

ঝর্ণা চৌধুরী বলেন আমরা প্রতিদিন ৪ জন করে আলাদা আলাদা দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় হাজির হতাম। তারপর যানবাহনে জীবানুনাশক স্প্রে করতাম এবং চালক ও যাত্রীদের বোঝাতাম কিভাবে তারা আক্রান্ত হতে পারেন, এবং কীভাবে নিজেদের এই মহামারী থেকে মুক্ত রাখা যাবে। জনসচেতনতার কাজ করতে গিয়ে তারা উপলব্ধি  করতে পারেন যে একটু ধৈর্য্য ধরে মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বললেই মানুষকে আপন করে নেওয়া যায়।

দুই হাজার মাস্ক তৈরি ও বিতরন : করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এক্ষেত্রে বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। প্রান্তিক মানুষ যেখানে খাবার পায়না সেখানে টাকা খরচ করে মাস্ক কিনবে কি করে। তাছাড়া এমন অনেক মানুষ আছেন যারা টাকা দিয়ে মাস্ক কিনতে চায়না কিন্ত ফ্রি-তে  পেলে ব্যবহারে আগ্রহী। এমন মানুষদের কথা চিন্তা করে পিজিএস এর স্বেচ্ছাসেবীরা দুই হাজার মাস্ক তৈরি ও বিতরণ করেন। তারা বাজার থেকে কাপড় ক্রয় করে নিজেরাই মাস্ক তৈরি করেন।

এক বিলাসী দ্রব্য বিতরণ : পিরিয়ড বা মাসিকের মত একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে লজ্জা আর সংকোচের শেষ নেই।আমাদের সমাজে নারী স্বাস্থ্য বিশেষ করে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে নানা রকম অসুখ বিসুখ হচ্ছে। সামাজিক কাজ করতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারি পিরিয়ডের সময়কার পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে তেমন কোন ধারণা এখনো গ্রামীণ প্রান্তিক সমাজে গড়ে উঠেনি। মেয়েরা মাসিকের সময় এখনো পুরনো সুতি কাপড় ব্যবহার করছে। তাই স্বেচ্ছাসেবী   সংগঠন ও এনজিওদের উচিত অন্যান্য সামগ্রীর সাথে সেনোরা বা ন্যাপকিন বিতরণ করা উচিত  বলে মনে করেন ঝর্ণা চৌধুরী।

এ বিষয়ে পিজিএস এর কর্ণধার জয়তুর্য আমেরিকা থেকে টেলিফোনে বলেন, লকডাউনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করবো করবো করে করা হচ্ছিলো না। অবশেষে ২৮মে World Menstruation Day উপলক্ষে বিতরণের জন্য স্থির করলাম। পাহাড়ি জনপদ বিবেচনায় খাগড়াছড়ি দিয়েই শুরু করেছিলাম । দরদাম নিয়ে আমার কোন ধারণা ছিল না। ভাবছিলাম প্রতি বক্স ২০/৩০ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে। সেদিন ঝর্ণার সাথে এই বিষয়ে আলাপ করে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। এক বক্স সেনোরা'র দাম নাকি ১৬০+ টাকা! আমার কল্পনাতেও  ছিল না যে, আমাদের দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিন একটি বিলাসজাত দ্রব্য। মনে হয় সিগারেটের দাম থেকেও কয়েকগুণ বেশি!

সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য ব্যাংক ও দোকানে বক্স : করোনা প্রতিরোধে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষ ঝুঁকি বাড়িয়ে চলছিলো।আর এ ক্ষেত্রে ব্যাংক, মুদির দোকান হটস্পট হয়ে উঠেছিলো। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে  গ্রাহকরা ব্যাংকের সামনে জটলা পাকিয়ে আক্রান্ত হতে থাকেন। পাড়া ও শহরের মুদির দোকানেও সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই।সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে পিজিএস একসাথে তাদের সব শাখা ভুক্ত এলাকায় ব্যাংক ও দোকানে বক্স অংকনের কাজ শুরু করে।

খাদ্যসামগ্রী বিতরণ : একটি দুঃসময়ে  মানুষের ভালো দিকটি যেরকম বের হয়ে আসে খারাপ দিকটাও একইভাবে বের হয়ে আসে। ভয়াল এই সময়ে এক শ্রেণীর মানুষ সরকারের দেওয়া চাল গরীব ও অসহায় মানুষদের না দিয়ে নিজেরা আত্মসাৎ করছে। আবার সিলেটের একজন শ্রমিক মারা যাওয়ার পর গ্রামবাসী করোনা আতংকে মসজিদের খাটিয়া বের করতে দেয়নি।

অথচ একই সময়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ন্যায়  পিজিএস এর স্বেচ্ছাসেবকরাও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে চষে বেড়াচ্ছেন। তারা সিলেট থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে থাকা পিজিএস এর ১৩টি শাখায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস হাতে সচেতনতা আর মানবতার বার্তা নিযে বাড়ি বাড়ি হাজির হচ্ছেন। হাসি ফুটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শত শত পরিবারে। এই সময়ে তারা ৩টন চাল, ২৫মন আলু, পিঁয়াজ, তেল ও ডাল বিতরণ করেছেন। এছাড়াও আগামী দিনগুলোতে আরো বেশী সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ বিষয়ে ঝর্না চৌধুরী বলেন, আমরা ডোনেশন নির্ভর সংগঠন নয়। এই সংগঠনে আমাদের কর্ণধার জয়তুর্য স্যার এককভাবে অর্থাযন করে থাকেন। অপরাজিতা, সূর্যশিখা, দ্বিপান্বিতা, মিশন হান্ড্রেড নামক সংগঠন রয়েছে। সেগুলার কার্যক্রমও পরিচালনা করতে হয়।

এই সময়ে পিজিএস স্বেচ্ছাসেবীরা ঠাকুরগাঁও জেলার ভোমরাদহ ইউনিয়নের কৈমারি গ্রামের রানা মিয়ার করোনাকালে মানবেতর জীবনযাপনের খবর পেয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।তিনি ছয় সদস্যের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।রানা মিযা দীর্ঘদিন ধরে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন।পিজিএস এর ঠাকুরগাঁও  শাখার জুয়েল জানান, আমরা রানা মিয়ার পরিবারকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্ত অত্যন্ত দুঃখের খবর এই যে, ত্রাণসামগ্রী নিয়ে পৌঁছানোর ঠিক আগের দিন রানা ভাই মারা যান। খবরটা পেয়ে আমরা মর্মাহত হই এবং রানা মিয়া মারা যাওয়ায় তার পরিবারের আগামী ছয় মাসের দায়িত্ব গ্রহণ করি।

পঞ্চগড় পিজিএস শাখা এগিয়ে যায় লাবুয়াপাড়া গ্রামের স্বামীহারা শারিরীক প্রতিবন্ধী রশিদা বেগম ও তার ছোট ছেলের পাশে। করোনায় গৃহবন্দী  রাশেদাকে চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এবং যেকোন বিপদে সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

ফেসবুকে পিজিএস কর্ণধার জয়তুর্য জানতে পারেন অন্ধ বাউল ফজলু  বয়াতির দুর্দিনের গল্প। বয়াতির সাত সদস্যের পরিবারের সবাই বাউল গানের সাথে যুক্ত। এটা এক আদর্শ বাউল পরিবারের অনন্য উদাহরণ। জানতে চাইলে জয়তুর্য জানান, যখন জানতে পারলাম লক ডাউনে ২ মাস যাবৎ মানবেতর জীবন যাপন করছেন।এ নিয়ে বয়াতির "আমি তো লাজে মরি কি যে করি গলায় দড়ি দিয়া,বিপদে পড়েছি আমি বাউলা গান শিখিয়া"গানটি শোনার পর থেকে কোনভাবে বয়াতির পরিবারকে সাহায্য করা যায় কিনা ভাবতে লাগলাম। ফেসবুক থেকে তার নম্বর সংগ্রহ করে আমি ও ঝর্ণা বয়াতির সাথে কথা বলি এবং এক মাসের খাবার হিসাবে ৩০ কেজি চাল, ২০ কেজি আলু, ৫ লিটার তেল, ৫ কেজি পেঁয়াজ ও লবণ, ২ কেজি ডাল, ১কেজি রসুন এবং জ্বর সর্দির প্রয়োজনীয় ওষুধ , বিস্কুট মুড়ি ও একমাস চলার মতো মশলা বয়াতির বাসায় পৌঁছে দেই।

নারী হিসেবে প্রধান সমন্বয়ক : নারী হিসেবে ঘরের বাইরে কাজ করা আগে থেকেই কঠিন ছিল। আর বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা আরও কঠিন হয়েছে বলে মনে করেন পিজিএসের সমন্বয়ক ঝর্ণা চৌধুরী। তিনি মনে করেন সংগঠনের একজন স্বেচ্ছাসেবক বা প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে মানুষের সেবা করা দূর থেকে উপলব্ধি করতে বা দেখতে সহজ মনে হলেও ততটা সহজ নয়। একজন নারী হিসেবে তাকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতেই হয়। শুরুতে পরিবারের সাপোর্ট পাননি। অন্য দশ পাঁচটা রক্ষণশীল পরিবারের মতোই তাকে তুমি মেয়ে, তোমার এসব দরকার নাই বলা হতো। মানুষের ভালোবাসা কতটা পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, দিনদিন  অনেক মানুষের ফিডব্যাক পাচ্ছি। অনেক সুন্দর সুন্দর কমপ্লিমেন্ট মানুষ করে। অনেক উৎসাহ, সমর্থন ও সাহস দেয়। এই জিনিসটা খুব ভালো লাগে। মনের জোর বাড়িয়ে দেয়।

পাঠকের মন্তব্য