স্বাক্ষর জাল করে ২৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক !

স্বাক্ষর জাল করে ২৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক !

স্বাক্ষর জাল করে ২৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক !

স্বাক্ষর জাল করে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বাকচুয়া লক্ষ্মীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মুন্সী সাইদুর রহমান। তিনি অবৈধভাবে ২৬ বছর ধরে এই পদে রয়েছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর জাল করে অর্থ উত্তোলন, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মুন্সী সাইদুর রহমান বাকচুয়া গ্রামের মৃত মুন্সী মজিবর রহমানের ছেলে। তিনি উপজেলা জামায়াতের রুকন। তার বিরুদ্ধে নাশকতা ও জালিয়াতির অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে এসব বিষয় নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন ওই স্কুলেরই এক সহকারী শিক্ষক।

জানা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য ১৯৯৭ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে তৎকালীন সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত মুন্সী সাইদুর রহমান প্রধান শিক্ষকের পদে আবেদন করেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক নিয়োগে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষা সনদে একের অধিক তৃতীয় বিভাগ থাকায় একমাত্র আবেদনকারী মুন্সী সাইদুর রহমানের আবেদনসহ পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ১৯৯৪ সালে আরও একটি নিয়োগ দেখিয়ে নিয়োগ বোর্ডের সব সদস্যের স্বাক্ষর জাল করে গোপনে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নেন মুন্সী সাইদুর রহমান। তার এমন জালিয়াতির বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা ও শিক্ষা অঞ্চলের খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন কয়েক শিক্ষক। তৎকালীন উপপরিচালক ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ সরেজমিন তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পান। একই বছরের ১৬ আগস্ট মুন্সী সাইদুর রহমানের নিয়োগ অবৈধ

ঘোষণা করে পুনরায় প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তর ও জেলা মাধ্যমিক

শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেও ১৯৯৮ সালের ২৪ জানুয়ারি একই নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিভিন্ন সময় বিদ্যালয় পরিচালনা পরির্ষদের সদস্যদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে ২৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন মুন্সী সাইদুর রহমান।

২০১৮ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ছমির উদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করে বিল উত্তোলন করেন ওই প্রধান শিক্ষক। সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে অর্থ উত্তোলনের ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান ছমির উদ্দিন ঝিনাইদহের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলাটির কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। স্বাক্ষর জাল করে অর্থ উত্তোলন ছাড়াও তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই প্রতিষ্ঠানের কয়েক শিক্ষক ও এলাকাবাসী। চলতি মাসের ৫ তারিখে ওই প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় ছোট-বড় গর্ত ভরাটের জন্য রাখা প্রায় ৩০ গাড়ি মাটিও তিনি গোপনে স্থানীয় ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। মুন্সী সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে সরকারবিরোধী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে অন্তত চারটি মামলাও রয়েছে।

লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জামাল উদ্দিন মণ্ডল বলেন, ওই প্রধান শিক্ষক জামায়াতের একজন স্থানীয় নেতা। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তিনি স্বাক্ষর জাল করে প্রতিষ্ঠানের অর্থ তছরুপ করেছেন।

স্কুলের সহকারী শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, স্বাক্ষর জাল করেই মুন্সী সাইদুর রহমান ২৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সী সাইদুর রহমান সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে শিক্ষকদের বেতন-বিল উত্তোলন ও নাশকতার মামলা থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, বৈধভাবেই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন। আর তৎকালীন সভাপতির অনুমতি নিয়েই তিনি তার স্বাক্ষর জাল করে বেতন-বিল উত্তোলন করেছিলেন।

ভায়না ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ছমির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ওই প্রধান শিক্ষক আমার স্বাক্ষর জাল করে অর্থ উত্তোলন করেছেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আদালতে জালিয়াতির মামলা করেছি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, আমি যোগদানের পর এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তছলিমা খাতুন বলেন, ইতোমধ্যে মুন্সী সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা থাকার বিষয়টি আমরা আদালতের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে পিপির মাধ্যমে জবাব দেওয়া হয়েছে। অন্য অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাঠকের মন্তব্য