এক যুগ দেখিয়েছে আমরা পারি; আমরা পারবো 

এক যুগ দেখিয়েছে আমরা পারি; আমরা পারবো 

এক যুগ দেখিয়েছে আমরা পারি; আমরা পারবো 

ড. আতিউর রহমান : আইএমএফ বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এডিবি বলছে, ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস দিচ্ছে এই পরিকল্পনা দলিল। যেখানে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের বেশি হারে সংকুচিত হবে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই হার নিশ্চয়ই আশা জাগানিয়া।

নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চতুর্থ সরকার তার দুই বছর পূর্তি করল। একই সঙ্গে বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো শেখ হাসিনার সরকার এক নাগাড়ে এক যুগ পাড়ি দিল। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন পয়লা নম্বরের গতিময় দেশ বাংলাদেশ। পুরো এশিয়ায় তার অবস্থান প্রথম দিকেই। সারা বিশ্বেও তার অবস্থান প্রথম পাঁচ-ছয়টি দেশের মধ্যে। এ যাবত যে পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার ৭৩ শতাংশই হয়েছে ২০০৯ সালের পর।

দুই বছর আগে যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার টানা তৃতীয় বারের মতো দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতি সমাজ ও রাজনীতিতে বইছিল সুবাতাস। এবারের নির্বাচনি ইশতেহারের শিরোনাম ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ।’

২০০৮ সালের ‘দিনবদলের সনদ’ ও ২০১৪ সালের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই সর্বশেষ এই ইশতেহারটি দেয়া হয়।

সরকারের ধারাবাহিকতা বরাবরই মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহায়ক হয়ে থাকে। অনেক দূরের লক্ষ্য ঠিক করতেও সাহায্য করে এই ধারাবাহিকতা। আমরা তাই সুদূরপ্রসারী জনবান্ধব সব নীতি-অঙ্গীকার প্রতিফলিত হতে দেখতে পাই এই সমৃদ্ধির স্বপ্নদলিলে।

এই দলিলে যেসব বিষয় প্রতিফলিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ; আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা; দক্ষ সেবামুখী ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন; জনবান্ধব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ; সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল; জনগণের ক্ষমতায়নের বাহন স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ; উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন; অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রকল্প; গ্রামে আধুনিক সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কৌশল গ্রহণ; ‘তারুণ্যের শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’; নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস; কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন; ২০২০ সালের মধ্যে সকলের জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা; ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ টেকসই শিল্পায়ন; শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমনীতি; যুগোপযোগী শিক্ষা; স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ; যোগাযোগ; ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মতো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি; ব্লু-ইকোনমির উন্নয়ন; জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা; শিশু কল্যাণ; প্রতিবন্ধী কল্যাণ; মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন; ধর্ম-সংস্কৃতি; ক্রীড়া; ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা; প্রতিরক্ষা; পররাষ্ট্র; এনজিও; এমডিজি ও এসডিজি অর্জন; ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০।

খেয়াল করলে দেখা যায়, আমাদের জাতীয় জীবনের এমন কোনো অংশ নেই, যাকে স্পর্শ করেনি নির্বাচনি অঙ্গীকার। এসব অঙ্গীকারের আলোকেই নতুন সরকার তার যাত্রা শুরু করে।

প্রথম অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এর পরের বছরেই চলে আসে করোনাভাইরাস মহামারি। অর্ধেক অর্থবছর ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ কোয়ার্টারে ‘সাধারণ ছুটি’ থাকায় অর্থনীতি দারুণ চাপের মধ্যে পড়ে। তা সত্ত্বেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ (বিবিএস)।

আইএমএফ বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এডিবি বলছে, ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস দিচ্ছে এই পরিকল্পনা দলিল। যেখানে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের বেশি হারে সংকুচিত হবে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই হার নিশ্চয়ই আশা জাগানিয়া।

এমন সংকটকালেও বাংলাদেশের অর্থনীতির এই নজরকাড়া অর্জনের পেছনে নিঃসন্দেহে নেতৃত্বের বিচক্ষণতার পরশ আছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা অনেক দূরে দেখতে পান। আর তাই তিনি সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এক অসাধারণ কল্যাণ বন্ধনে বেঁধে ফেলার সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন কৌশল গ্রহণে পিছপা হন না।

পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ছাড়াও তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কট্টর সমর্থক। তাই তার পরিকল্পনায় যেমন স্বদেশি মেজাজ থাকে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতির চাওয়া-পাওয়া প্রতিফলিত হয়। তবে তার পরিকল্পনার ‘হৃদ মাঝারে’ থাকে মানুষ; বঞ্চিত, অবহেলিত ও দুঃখী মানুষ। বিশেষ করে মানুষের কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি আপসহীন। আর সে কারণেই এই মহামারির সময়ে কী করে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের কর্মচ্যুতি না ঘটিয়েও শিল্প কারখানাগুলো চালু রাখা যায়, ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সক্রিয় রাখা যায় এবং আমাদের অর্থনীতির রক্ষাকবচ কৃষি খাতকে অটুট রাখা যায়, সে জন্য জিডিপির ৪ দশমিক ৩ শতাংশ পরিমাণের ২১টি প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করে এক আশাবাদী বার্তা সেই এপ্রিল মাসেই দিয়েছিলেন।

একই সঙ্গে এসব প্রণোদনা কর্মসূচি যাতে যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, সে দিকটা দেখার জন্য সংকটকালে তিনি নিয়মিত প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বসেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সংকট মোকাবিলায় চলমান ‘রেজিলিয়েন্স’ কৌশলটিই তুলে ধরেছেন। নিরন্তর সংগ্রাম করে টিকে থাকা বাংলাদেশের লড়াকু মনের উত্তরাধিকারী বঙ্গবন্ধুকন্যার এমন নেতৃত্বের সুফল এখন সারা দেশই পাচ্ছে।

নিঃসন্দেহে এই সংকটে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। গরিব আরও গরিব হয়েছে। নতুন গরিব দারিদ্র্যের কাফেলায় যুক্ত হয়েছে। বিশ্বজুড়েই এমনটি ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এদের মনে ফের বাঁচার আশা জাগিয়েছে। নতুন করে বাঁচার জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা ও সরকারি নীতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদেরও এই মহামারি থেকে উদ্ধারের সংগ্রামে যুক্ত রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। তাই অনেক দেশের চেয়ে ভালোভাবেই এই সংকট উত্তরণের দিশা দেখাচ্ছে বাংলাদেশ।

টিকা আসছে। যেসব এলাকায় এবং যে বয়সী জনগোষ্ঠীর মাঝে এই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি হয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেসব এলাকায় এবং সেসব জনগোষ্ঠীকে আগেভাগে টিকা দিতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সূচকে বিরাট উলম্ফন ঘটবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর যে জোর সরকার এখন দিচ্ছে, তা বজায় রাখা গেলে আমাদের জীবন ও জীবিকা দুইই সংহত হবে।

পুরো সমাজ ও অর্থনীতিতে ‘আমরাও পারি’ ইতিবাচক ভাবনাটির সংক্রমণ ঘটবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের বিচক্ষণ নেতৃত্ব বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এই রূপান্তরে তার চিরায়ত সম্মুখসারির ভূমিকা পালন করতে পিছপা হবেন না।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে বঙ্গভবনে জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করার সময় বলেছিলেন, আমরা তিনভাবে শিখি। বই পড়ে শিখি। অন্যকে দেখে শিখি। আর করে করে শিখি।

তিনি বলেছিলেন, শেষের ধারাতেই তিনি বেশি বেশি শিখেছেন। আমরাও এই মহামারি মোকাবিলা করে করে অনেক কিছু শিখেছি। শুরুতে হয়তো ভুল-ভ্রান্তি ছিল। কিন্তু আমরা তা শুধরে নিতে পেরেছি। শিক্ষার এই ধারা সমাজে ও প্রশাসনে অব্যাহত থাকুক। এই সংকটকালে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নীতি সক্রিয়তা ও সমন্বয়ের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তা অব্যাহত থাকুক। একই সঙ্গে তিনি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। এসব নীতির কথা সহজ ভাষায় জনগণকে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশা আগামী বাজেটেও গত বাজেটের মতো জীবন ও জীবিকা সংরক্ষণের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এ জন্য অর্থের জোগান বাড়াতে স্বদেশে ও বিদেশে আমাদের কর্মতৎপরতা নিশ্চয়ই বাড়াতে হবে। তবে প্রয়োজনে বাজেট ঘাটতি আরও খানিকটা বাড়িয়ে হলেও আগামী বাজেটেও আর্থিক সংগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের রাজস্ব সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে আরও ডিজিটাইজ করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির প্রয়াস আরও জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তার সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির ধারাটি বজায় রেখে আগামী বাজেটে বাস্তবায়নেও তার সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে বলে আমার বিশ্বাস।

তবে শুধু অর্থ ঢাললেই চলবে না। এই অর্থ যেন যারা উৎপাদন করেন, যারা সেবা দেন সেসব উদ্যোক্তাদের কাছে ঠিকঠাক মতো পৌঁছাতে পারে, সে দিকটা মনিটরিং করাও খুবই জরুরি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই আগামী বাজেটের অগ্রাধিকারের পয়লা নম্বর খাত হিসেবে আবারও স্বাস্থ্য খাতকেই বেছে নেয়া সঠিক হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে গ্রামে যথোপযুক্ত ডিজিটাল অবকাঠামো সেভাবে গড়ে না ওঠায় স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় বেশ বিঘ্ন ঘটেছে।

আগামীতে যাতে এই পরিস্থিতিতে আর না পড়তে হয় সে জন্য শিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তির আরও প্রসার, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি করে বরাদ্দ দেয়া সঠিক হবে। তা ছাড়া এবার কৃষি খাত আমাদের অনেকটাই রক্ষা করেছে। তাই অধিক খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও বীজ সরবরাহে প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। কৃষি পুনর্বাসন ও বিভিন্ন উপকরণে ভর্তুকি তথা বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে।

ব্যাপক কর্ম সৃজনের জন্য গ্রামীণ ও শহরে পূর্ত-কর্ম জোরদার করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় আরও বাড়াতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগীদের যে তালিকা ধরে মহামারি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন সহায়তা দিয়েছে তা কালবিলম্ব না করে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে যুক্ত করা উচিত। এখনও সময় আছে এই ডাটাবেজ পরিমার্জনের। আর পরিমার্জিত সেই তথ্যভান্ডার হাতে নিয়ে বাড়তি সামাজিক সুরক্ষা দিলে অপচয় অনেকটাই কমে আসবে।

স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা চটপটে এবং প্রযুক্তিপ্রেমী। তাদের উদ্যম এ কাজে লাগাতে পারলে নিশ্চয়ই ভালো ফল পাওয়া যাবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এবারের বাজেটেও গুরুত্ব পাবে বলে আশা করছি। তা হলো কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য প্রণীত প্রণোদনা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন, সম্প্রসারণ ও মনিটরিং। আশা করি বাজেটপ্রণেতারা এদিকে পর্যাপ্ত নজর ও অর্থ দুইই দেবেন।

এতক্ষণ ধরে আমরা মহামারির আলোকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের সাফল্য এবং আগামী দিনের করণীয় বিষয়ে বললাম। এবার একটু নজর দিই আরেকটু দূরের পরিকল্পনার দিকে। নির্বাচনি ইশতেহারে যে সমৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে তা অর্জন করতে হলে আমাদের অবকাঠামো মজবুত করতেই হবে। আর সে জন্যই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৬৫ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর ৮১ শতাংশই আসবে ব্যক্তি খাত থেকে। সে জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম-নীতি সহজ করার কোনো বিকল্প নেই। বিডাসহ সরকারের বিভিন্ন রেগুলেটারি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাহকবান্ধব ‘ওয়ান স্টপ’ সেবা দেবার উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে।

এদিকে নীতি মনোযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। আগেই বলেছি, এ বছরই বর্তমান সরকার তার ধারাবাহিক শাসনের এক যুগ পূর্তি করল। এই সময়ে ব্যাপক যেসব সাফল্য এসেছে সেগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করছি।

১. সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি বড় পরিকল্পনা করতে পারে তা মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতিই প্রমাণ করে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প সামনের বছরই চালু হতে যাচ্ছে। এক পদ্মা সেতু প্রকল্প চালু হলেই দক্ষিণ বাংলার ব্যবসা বাণিজ্যে এমন গতি আসবে যে আমাদের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হারে ১ শতাংশ যুক্ত হবে। অন্যান্য মেগা প্রকল্পের সুফলও একই ধারায় আসবে। তা ছাড়া আড়াইহাজার, বঙ্গবন্ধু পার্ক ও মোংলা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পায়রা বন্দর ও মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো চালু হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে যে বিপ্লব ঘটবে তা আমরা অনুমানও করতে পারছি না। এর সঙ্গে শাহজালাল অন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চতুর্থ আধুনিক টার্মিনাল চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা খুবই সহজ হবে। অবকাঠামোর উন্নতি মানেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তাই ১ কোটি ১৩ লাখ নয়া কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে তা খুবই অর্জনযোগ্য।

২. ২০২০ সালের মধ্যে সবার ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহের যে আশ্বাস সরকার দিয়েছিল, তা এরই মধ্যে অর্জন করা গেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তাতে যেন আরও বেশি করে সবুজ শক্তি যুক্ত করা হয়, তাই আশা করছি। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমন করে ‘সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ’ বিশ্ব গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছেন, তাতে আমি খুবই আশাবাদী যে সবুজ পুনরুদ্ধারের পথেই তিনি হাঁটবেন।

৩. কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য এককথায় অভাবনীয়। ইতোমধ্যেই খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা আমরা অর্জন করেছি। আমরা এখন চাল, সবজি ও মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। ফুল, ফল উৎপাদনেও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছি আমরা। পোল্ট্রি ও গরুর খামার উদ্যোগেও আমরা দ্রুত এগোচ্ছি। এখন আমরা নিরাপদ ও প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চাই।

৪. বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তার বলয় দিনদিনই বাড়ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের পরিচয় পেতে যাচ্ছে। অনেক উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশের এই কল্যাণমুখী রূপান্তর সত্যি আশা জাগানিয়া। ইতোমধ্যেই প্রান্তিক পরিবারগুলোর প্রতিটিই যেন একটি বাসযোগ্য ঘর পায় তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এই ঘরগুলো শুধু থাকার জায়গা হবে না, বরং এগুলো গ্রামীণ কুটির শিল্পের ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করবে।

৫. প্রবাসী আয়ে এই মহামারির বছরেও চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এ বছর ২১.৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সরকারের ২% নগদ প্রণোদনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল অর্থায়ন, নিয়ম-নীতি সহজিকরণ এবং এজেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং চালুকরণ এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে।

৬. বাংলাদেশ এশীয় টাইগারদের মতো খুবই দ্রুত কম দক্ষ শ্রমিক ব্যবহার করে গার্মেন্টস ও লেদার শিল্পকে প্রণোদনা দিয়ে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে এখন জিডিপির ৩৫ শতাংশ আসছে শিল্প খাত থেকে। শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন ৫ জন কর্মক্ষম নারীর দুই জনই আনুষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত। ভারতে একজন। বাংলাদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গার্মেন্টস বিকাশে নানামুখী প্রণোদনা দেয়ার সারা বিশ্বে চীনের পরই আমাদের অবস্থান করে নিতে পেরেছি। এর ফলে নারী কর্মীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান ঘটেছে যার ইতিবাচক প্রভাব পুরো সমাজেই পড়েছে।

৭. আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দৌড়েও আমরা অগ্রগামী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রচুর তারল্য যাচ্ছে। তাই অকৃষি আয় এখন গ্রামীণ আয়ের ৬০ শতাংশ। দারিদ্র্য দ্রুত কমছে। গত এক দশকেই ২০ শতাংশে নেমে এসেছিল। মহামারিতে সাময়িকভাবে দারিদ্র্য ফের বেড়েছে। তবে সরকারের নেয়া প্রণোদনামূলক নীতিগুলোর কারণে দ্রুতই আমরা দারিদ্র্য নিরসনের পুরোনো ধারায় ফিরে আসতে পারব বলে আশা করছি।

সবশেষে বাংলাদেশের অভাবনীয় রূপান্তরের গল্পটি শেষ করব তার এলডিসি পরিচয় ছেড়ে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের কথাটি দিয়ে। এরই মধ্যে টেকনিক্যালি বাংলাদেশ তার মাথাপিছু আয় ও আর্থিক সক্ষমতার বিচারে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে আরেকটি বিশ্লেষণ হবে। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। আগামী তিনটি বছর প্রস্তুতি নেয়ার সময়; উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের সময়; আত্মবিশ্বাস অর্জনের সময়।

আশা করি যে ধরনের সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন দেখছেন তার আলোকেই আমাদের দেশের সব মানুষ তাদের পরিশ্রম, দক্ষতা ও সক্ষমতা দিয়ে এই রূপান্তরের পথকে মসৃণ করতে এগিয়ে আসবেন। সরকার, ব্যক্তি খাত ও অসরকারি খাত মিলেমিশেই আমরা এসডিজি অর্জন করব, প্রথমে উচ্চ-মধ্যম এবং পরে উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ উন্নীত করব।

এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়ন করতে আমাদের একাট্টা থাকতে হবে। মুজিবর্ষে দাঁড়িয়ে সুবর্ণজয়ন্তীর এই অবিস্মরণীয় সময়ে জাতি হিসেবে আমাদের এই শপথ নিতে হবে যে, ‘আমরা পারি, আমরা পারব। কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

পাঠকের মন্তব্য