নিষ্ঠুর পৃথিবীর চরম নির্মমতার শিকার ও হার না মানার গল্প 

টি,এম,এ, মমিন; অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক

টি,এম,এ, মমিন; অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক

নিষ্ঠুর পৃথিবীর চরম নির্মমতার শিকার হার না মানা সুফিয়া বেওয়া ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত তার ছোটপুত্র সামিউল ইসলাম সুমন। সুফিয়া বেওয়ার ১ম বিয়ে হয় মো. সারোয়ার এর সাথে, তাদের ঘরে দুলালী ও লাকী নামের দু'কন্যার জন্ম হয়। কন্যাদের বয়স যখন যথাক্রমে ১৪ ও ১২; এমন সময় সুফিয়ার স্বামী সারোয়ার টানা ২৭ দিন অসুস্থ থেকে মৃত্যুবরণ করেন।

সদ্য স্বামী হারানো এবং গাওগেরামের সাবালিকা বয়সী দু'কন্যাকে নিয়ে সুফিয়া বেওয়া অথৈ সাগরে পড়েন।

শ্বশুর শ্বাশুড়ী তার কষ্ট লাঘব করতে তাদের ৩য় পু্ত্র অর্থাৎ মৃত সারোয়ার এর অবিবাহিত ছোটভাই ইসমাইলের সাথে সুফিয়ার বিয়ের কথা বললেন। সুফিয়া বেওয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও কন্যাদের জীবনের কথা ভেবে রাজী হলেন এবং ইসমাইলের সাথে ২য় বিবাহোত্তর জীবন শুরু করলেন।

ইসমাইলের সাথে তার সংসার জীবনে ১ম সন্তান সুজন ইসলামের বয়স যখন ৫ এবং ২য় বার নয় মাসের অন্ত:স্বত্বা, ঠিক সেই সময় কোনো এক অন্ধকার ঝড়ের রাতে সিঁদ কেটে ঘরে দস্যু ঢুকলে ইসমাইল দস্যুকে জাপটিয়ে ধরে ফেলে। দস্যু, ইসমাইলের হাত থেকে বাঁচতে ইসমাইলের বুকে ছুরি চালিয়ে তাকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। সুফিয়া শত চেষ্টায়ও স্বামীকে রক্ষা করতে পারেনি।

সুফিয়া বেওয়ার জীবনে আবারও অন্ধকার নেমে আসে। এবার ২য় স্বামীকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যায় এবং স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে কোর্ট, কাচারি, উকিল, মোক্তার, পুলিশ, দেওয়ানি, মাতবর, চেয়ারম্যান, মেম্বারদের কাছে ঘুরতে থাকে। বাড়তে থাকে তার জীবনের অবর্ণনীয় তিক্ত অভিজ্ঞতা।

এমনি সময় ইসমাইল হত্যার ২৩ দিন পর সুফিয়া বেওয়া ২য় পুত্র সামিউল ইসলাম সুমনের জন্ম দেন। এই সামিউল ই আজ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ২য় বর্ষে পড়ে। সামিউল তার পিতার ছবি পর্যন্ত দেখেনি। 

ইসমাইল-সুফিয়া দম্পতির ১ম পুত্র সুজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে একাউন্টিং এ মাস্টার্স শেষ করেছে, চাকুরীর চেস্টা করছে এখন। শেষ পর্যন্ত সকল প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে সুফিয়া বেওয়া তার স্বামী হত্যার বিচার পেয়েছে, হত্যাকারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সুফিয়া বেওয়া তার দু'কন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন, কন্যারা ভাল আছে।

আমার গ্রামের ঘটনা। বাইরে থাকায় এতকিছু জানতাম না। মহিলার নিজ মুখে তার জীবন সংগ্রাম, চেনা মানুষের অচেনা রূপ, পদে পদে মানুষের অপমান, স্বামী হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে সামাজিক তিরস্কার, নিজের উপর হুমকি, সন্তানদের মানুষ করা- ইত্যাদি বর্ণনা শুনে আমি হতভম্ভ হয়ে গেছি। মহিলা একনাগাড়ে ২ ঘন্টা কথা বলেছে, আমি শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনেছি, শেষে শুধু বললাম," আপনি ভাল থাকবেন।" মনে হল, তিনি জীবনে এই প্রথম প্রাণ খুলে সব কথা বললেন, হালকা হলেন।

জীবন কত কঠিন। জ্বী, অশিক্ষিত অজপাড়াগায়ের একজন অতি সাধারণ নারী হয়েও এই কঠিনেরে তিনি করেছেন জয়।
আমি সাহিত্যিক নই, নির্মাতাও নই- না হলে হয়তো এই কাহিনী নিয়ে একটি সাহিত্যকর্ম বা সিনেমা হয়ে যেতো। পর্দায় লেখা উঠতো,"সত্য ঘটনা অবলম্বনে"।

যাহোক, শেষপর্যন্ত প্রকৃতি/আল্লাহ/ইশ্বর/ভগবান এর উপর অবিচল আস্থা ও জীবনব্যাপী সংগ্রাম সুফিয়া বেওয়াকে এতদূর নিয়ে এসেছে এবং তাকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। তার ছেলে ডাক্তার হয়ে কাউকে হত্যা নয়-বাঁচিয়ে তুলবে, এ আশা করেন। 

"আল্লাহ সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগ্রহণকারী"- কাকে কিভাবে কোথায় তুলবেন বা নামাবেন, তিনিই ভাল জানেন। কে জানতো যে, গর্ভের সেই সন্তানটি আজ ডাক্তারি পড়বে ? কত পিতামাতাই তো শতসহস্র চেস্টা করেও তার সন্তানটিকে মেডিকেলে ভর্তি করাতে পারছে না!

"ভবিষ্যৎ বিষয়টা বড়ই বিচিত্র ও বিপুল সম্ভাবনাময়"।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : Tma Momin
লেখক : অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) লালমনিরহাট জেলা। 

পাঠকের মন্তব্য