পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা

নদী প্রাণের স্পন্দন, জীবনতরঙ্গ, বাংলাদেশের সত্যরূপ। অনন্ত জলরাশি ও সবুজ বিতরণের সুবাদে প্রশ্নাতীতভাবে নদীই দেশের সম্পদের প্রধানতম উৎস। কেবল সম্পদের উৎস নয়, নদী সুন্দরও। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডুবোচরের কারণে নৌপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের অপরিণামদর্শী আচরণও নদীকে করে সঙ্কুচিত। দখল-দূষণে নদীগুলো হয়ে উঠে এক একটি বিষাক্ত সরু খাল। এছাড়া নদ-নদীতে নাব্য সংকট সৃষ্টির পেছনে আর একটি কারণ হচ্ছে নদীতে পলি জমে যাওয়া।

তবে বন্ধ্যা সময় পেছনে ফেলে নদীকে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পালা এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। জীবন জোয়ারের তান্ডবে হারিয়ে যেতে বসা নদীগুলোও ফিরে আসবে উত্তাল ঢেউ, ৫৬ হাজার বর্গমাইলে প্রাণের জোয়ার। যার সূচনা কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল। এবার টানেলে যুক্ত হবে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া। পদ্মা নদীর নিচ দিয়ে হবে এই টানেল। ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং টানেল খুঁড়তে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ মাটি পাওয়া যাবে তা দিয়ে গড়ে তোলা যাবে নতুন শহর।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, পদ্মা নদীর নাব্য ধরে রাখতে সরকার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় নৌরুটে সেতু না করে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশে (আইইবি) এক সেমিনারে বক্তব্য দেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, শুধু রাস্তা নির্মাণ করলেই হবে না, মজবুত করতে হবে। নদী বাঁচাতে হবে, তা না হলে শ্যামল বাংলাদেশ থাকবে না। এত ব্রিজ করার দরকার কী? পদ্মা সেতু একটা হয়েছে। এখন দাবি উঠেছে দৌলতদিয়ায় আরেকটি সেতু হোক। দুটি সেতু হলে নদীর নাব্যতার কী হবে? এটা কিন্তু আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় আমরা টানেল নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা করছি। ওই দিকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে গাইবান্ধা রুটে আরেকটি টানেল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। কয়েকটি জায়গায় টানেলের দিকে নজর দিতে হবে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলে যে টানেল হচ্ছে সেটারও ৭৫ ভাগ কাজ হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং উপকমিটির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুর বলেন, দেশে উত্তর-দক্ষিণ সংযোগকারী যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও এ পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম সংযোগকারী সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। খুলনা অথবা বরিশাল থেকে কোনো গাড়ি যদি চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে চায়, তাহলে ঢাকা হয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো সরাসরি ব্যবস্থা নেই। পূর্ব-পশ্চিম সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করতে পারলে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের ওপর চাপ বহুলাংশে কমে যাবে।

ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে সবুর বলেন, সমুদ্র উপকূলজুড়ে তাদের রোড নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে বন্দর থেকে বন্দরে পণ্য পরিবহনে তাদের একটা সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। আমরা সমুদ্র উপকূল দিয়ে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারলে দেশের ব্লু-ইকোনমিতে একটা বিশাল প্রভাব পড়বে।

এর আগে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর পর যমুনা নদীতেও টানেল নির্মাণের চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। শুধু তাই নয়, ‘যমুনা অর্থনৈতিক করিডোর’ নামে যমুনা নদীকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় আনতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানান তিনি।

সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম-বিএসআরএফ আয়োজিত সংলাপে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতুর বিকল্প একটি সেতুর প্রয়োজন আছে। যমুনাতে একটি টানেলের সমীক্ষা কার্যক্রম চলছে। সেটির যদি সঠিক ফল আসে তাহলে ভবিষ্যতে সেখানে (যমুনা নদী) একটি টানেল নির্মাণ করা হবে। এ ধরনের একটি চিন্তাভাবনার কথা আমরা জেনেছি। এটি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলীর পর দেশে দ্বিতীয় টানেল হবে যমুনায়।

এদিকে টানেল নির্মাণের ফলে চট্টগ্রাম শহর চীনের সাংহাই নদীর মতো ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেল গড়ে উঠবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পাশাপাশি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে।

২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী টানেলের খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ টানেলটি পতেঙ্গার নেভাল অ্যাকাডেমি পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে কাফকো ও সিইউএফএল পয়েন্টের মাঝখান দিয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপারে গিয়ে উঠবে। মূল টানেলের দৈর্ঘ্যরে মধ্যে টিউবের দৈর্ঘ্য হবে ২ হাজার ৪৫০ মিটার। প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় প্রায় ১৬ ফুট। টিউব দুটির একটি দিয়ে শহর থেকে গাড়ি প্রবেশ করবে। আরেকটি টিউব দিয়ে ওপারে যাবে। এজন্য কর্ণফুলীর পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক এবং ৭২৭ মিটার ওভারব্রিজও তৈরি করা হবে।

বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। আর ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা অর্থায়ন করছে চীন সরকার। এই টানেল চালু হলে পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতি। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো আকর্ষণীয় স্থান।

এদিকে বান্দরবানেও সড়ক যোগাযোগ সহজ করতে নির্মাণ হচ্ছে ৫০০ ফুট দীর্ঘ একটি টানেল। এই টানেল বর্তমান শহরের বাস স্টেশনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় টার্মিনাল (হাফেজঘোনা) সড়ককে সংযোগ করবে। এটি পর্যটন শহর বান্দরবানের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই টানেলটির নির্মাণকাজ চলমান। আর এটি পার্বত্য জেলা বান্দরবানের জন্য প্রথম টানেল।

পাঠকের মন্তব্য