প্রেম আর দ্রোহের কাব্য আমার বঙ্গবন্ধু

প্রেম আর দ্রোহের কাব্য আমার বঙ্গবন্ধু

প্রেম আর দ্রোহের কাব্য আমার বঙ্গবন্ধু

(১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস)

হারুন উর রশীদ : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ আমি প্রথম শুনি লংপ্লে রেকর্ডে– মাইকে। তবে এর আগে ওই ভাষণের ব্যাপারে জেনেছি। আরও পরে এর ভিডিও দেখেছি। আর যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন ওই ভাষণ যারা সরাসরি রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উপস্থিত থেকে শুনেছেন তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, প্রতিবেদন করেছি। অনুভব করার চেষ্টা করেছি সেই দিনটাকে। বঙ্গবন্ধুকে।

যতদূর মনে পড়ে, আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন ১৫ আগস্ট শোক দিবসে এই ভাষণ আমি মাইকে শুনি। আমাদের বানারীপাড়া হাই স্কুলের পাশে কোনো একটি দোকানে মাইকে বাজানো হচ্ছিল। এরশাদের আমল। পরে পুলিশ আসে। মাইক নিয়ে যায়। তবে পুলিশ মাইক নিয়ে যাওয়ার আগেই পুরো ভাষণ আমি শুনে ফেলি। আমি ভাষণ শুনেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। আমার মতো আরও অনেকে সেখানে তখন দাঁড়িয়ে যান।

এরপর যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, তখন বানারীপাড়া ডাকবাংলোয় ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে আবারও মাইকে ওই ভাষণ বাজানো হয়। সেবারও পুলিশ আসে। ভাষণ বন্ধ করে দেয়। তখনও এরশাদের আমল।

আমি আগেও খেয়াল করেছি, এখনও হয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজলেই লোকজন দাঁড়িয়ে যান। দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে ভাষণ শোনেন। তারা যেন অন্য এক জগতে চলে যান।

তবে আমি সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হই, যখন প্রথম এই ভাষণের ভিডিও দেখি। আমি বঙ্গবন্ধুর সহজাত নান্দনিকতায় মুগ্ধ হই। এর চেয়ে কাব্যিক আর সুন্দর আমার কাছে আর কিছুকে মনে হয় না।

আমার দুই ছেলেমেয়ে এখনও শিশু। ছেলেটির বয়স দশ আর মেয়েটির আট। স্কুলে পড়ে। তিন বছর আগে তারা দুজন মিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভিডিও দেখতে চাইল। বাসার কম্পিউটারে ছেড়ে দিলাম। তারাও তন্ময় হয়ে শুনল। কী বুঝল জানি না। তবে তারা আলোড়িত। এরপর তারা বহুবার শুনেছে আর তর্জনী উঁচিয়ে তারাও প্রতিটি লাইন সঙ্গে সঙ্গে বলেছে।

সবাই বিশ্লেষণ করেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু আমি অনুভব করি একজন আত্মবিশ্বাসী সুপুরুষের প্রেম-বিদ্রোহ-মুক্তি আর ভালোবাসার কবিতা।

আমি উপজেলা শহর থেকে প্রথম ঢাকা আসি ১৯৮৭ সালে এসএসসি পাসের পর। আমার সহপাঠী ও বন্ধু বাবলুর বড় ভাই নুরুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। বাবলুও ছিল। ঢাকায় আসার কারণ ছিল ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া। নুরুদ্দিন ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইআর-এ পড়তেন। থাকতেন জহুরুল হক হলে। আমরা তার হলেই উঠলাম। তিনি আমাদের দুজনকেই ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা ওই বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন এক অচেনা অনুভূতি কাজ করে আমার ভেতরে। অনুভবের চেষ্টা করি আমার স্বপ্নের পুরুষকে। আর নুরুদ্দিন ভাই আমাদের শোনাচ্ছিলেন ১৫ আগস্ট কালরাতের কথা।

এরপর কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার দুই বন্ধু সুমন জাহিদ আর আমিনুল ইসলাম সজল। তরুণ দুই বঙ্গবন্ধুপ্রেমী। আমিও তাদের সঙ্গে জুটে যাই। খ্যাতিমান জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক তখনও বেঁচে আছেন। সুমন তার কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনাতে।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে সাংবাদিকতা শুরু। ৩২ নম্বরের বাড়িটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হওয়ার পর ওই বাড়িতে গিয়ে আমি বঙ্গবন্ধুকে আরও বেশি করে উপলব্ধি করি। বাড়িটি মিলিয়ে দেখি ইতিহাসের সঙ্গে। প্রতিটি কক্ষ আর গ্যালারি ঘুরে দেখি। মেলাতে চেষ্টা করি কোথায় তিনি ঘুমাতেন, কোথায় তিনি রাজনৈতিক আলাপ করতেন, কোথায় বসে তিনি তাঁর প্রিয় এরিনমোর তামাকে কালো পাইপে টান দিতেন। আর কোথায় তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে শুয়ে-বসে গল্প করতেন। তাঁর পোশাক দেখি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি। ডাইনিং টেবিল। কমলা রঙের টেলিফোন। বসার চেয়ার। চশমা।

দোতলার সিঁড়িটি এখন সংরক্ষিত, যেখানে ঘাতকদের মুখোমুখি হন বঙ্গবন্ধু, সেই সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমি বারবার চোখ বুজে অনুভবের চেষ্টা করেছি জনককে, জাতির পিতাকে। স্বাধীনতাকে, বাংলাদেশকে। ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখি কোথায় পড়ে ছিল জনকের পবিত্র শরীর। কোথায় লুটিয়ে পড়েছিলেন, রক্তাক্ত হয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্নপুরুষ। ঝাঁজরা হয়েছিল বাংলাদেশের হৃদয়।

আর নিচে নেমে বারবারই আমি গিয়েছি পায়রার খোপের কাছে। বঙ্গবন্ধুর ওই বাড়িতে পায়রার সঙ্গেও তাঁর ছবি আছে। আমি মেলাই। আমি দেখি এক শান্তির পায়রা ওড়ানো জনককে। যিনি স্বাধীনতার আগে চীনে শান্তি সম্মেলনে গিয়ে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।’

সাংবাদিক হিসেবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পুরোটাই কাভার করেছি আমি। যখন নিম্ন আদালতে বিচার শুরু হয়, তখন আমি ‘সংবাদ’-এ কাজ করি। আমি অফিস থেকে রীতিমতো আব্দার করে এই অ্যাসাইনমেন্ট নিয়েছিলাম। এরপর হাইকোর্ট। আপিল আদালত। ঘাতকদের ফাঁসির রায় কার্যকর। সবসময়ই ছিলাম। ফাঁসির রায় কার্যকরের সময় আমি একুশে টেলিভিশনে। এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আমার কাছে ছিল বঙ্গবন্ধুকে জানা। ঘাতকদের বর্বরতাকে বোঝা। বিশ্বাসঘাতকতার ঘৃণ্য চরিত্রদের দেখা। এই মামলার বিচার শুরুর আগেই আমার পরিচয় হয় আব্দুর রহমান রমার সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গৃহকর্মী, এই মামলার অন্যতম সাক্ষী। ৩২ নম্বরে রমাকে নিয়ে আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। তার কাছ থেকে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছি সেই কালরাতের কথা। বুঝেছি সেই রাত ছিল কালোর চেয়েও অধিক কালো। বঙালির দুর্ভাগ্যের রাত। কাপাল পোড়ার রাত। রমার কাছ থেকেই জেনেছি সেই রাতে শিশু শেখ রাসেলের শেষ কথা, ‘আমি মায়ের কাছে যাব।’

২০০৯ সালে শেখ রাসেলকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বানানোর সময় আমি তার ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের বেঁচে থাকা শিক্ষক, তার সহপাঠীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি, সাক্ষাৎকার নিই। বঙ্গবন্ধু তখন স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত থাকায় শেখ রাসেলের স্কুলের প্রোগ্রেস কার্ডে বাসার কেউ সই করে দিলেই হবে বলে জানানো হয়েছিল স্কুল থেকে। বঙ্গবন্ধু শুনে বলেছিলেন, ‘রাসেলের বাবাই তার কার্ডে সই করবে।’ বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দরজা রাসেলের সহপাঠী আর শিক্ষকদের জন্য সব সময় খোলা থাকত।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে জেলখানায় বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজ হাতে ফুল ফুটিয়েছেন। ফুলের বাগান করেছেন তিনি। ফুটিয়েছেন গোলাপ। সেই গোলাপ সহযোদ্ধাদের উপহারও দিয়েছেন। এই কোমলপ্রাণ বঙ্গবন্ধুই আবার ফরিদপুর কারাগারে অনশনে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে চেয়েছিলেন। পণ করেছিলেন মুক্তি না দিলে জেলখানা থেকে তাঁর লাশ বের হবে। আমার অনুভবে তাই তিনি কোমলে কঠিনে জাতির পিতা। যাঁর হাঁটুর সমানও কেউ নন এই জনপদে।

মৃত্যুকে তিনি পরোয়া করেননি। দেশের মানুষের প্রতি পরম বিশ্বাস আর ভালোবাসা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি দেশের মানুষকে ভালোবেসে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতেন। তাই তাঁর ৩২ নম্বরের বাড়িতে ছিল না তেমন কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। তিনি কখনও পালাতে চাননি। তাই বারবার কারাগারে গেছেন।
আমার দুর্ভাগ্য, আমার আফসোস, এমন এক নেতাকে চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আরেকটু আগে আমার জন্ম হলে কী এমন হতো!

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয় না। ঘাতকরা কীটে পরিণত হয়। কবি শামসুর রাহমান আমাকে সেই আলো দিয়েছেন, ঘুচিয়ে দিয়েছেন না দেখার আফসোস। আমি এখন 

কবির মতোই অনুভব করি–
‘ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয় জ্যোৎস্নার সারস,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পতাকার মতো
দুলতে থাকে স্বাধীনতা,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে
মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’
আর আমি ধন্য যে তিনি আমাদের জাতির পিতা। জনক তোমায় সালাম।

লেখক: সাংবাদিক

পাঠকের মন্তব্য