বদ্ধ মিনহাজ নদী শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের অভিশাপ

বদ্ধ মিনহাজ নদী শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের অভিশাপ

বদ্ধ মিনহাজ নদী শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের অভিশাপ

এক সময়ের খরস্রোতা মিনহাজ নদীর, লোনাপানি থেকে এলাকার মানুষকে বাঁচাতে স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে নদীর গড়ইখালী-লস্কর সীমান্ত শিবসা নদীর সংযোগ স্থানটি বাঁধ দেয়া হয়। পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে স্লইচগেট নির্মাণ করা হয়। কালের বিবর্তনে প্রকৃতি এবং মনুষ্য সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতায় কারণে বদ্ধ মিনহাজ নদী এখন আশীর্বাদ নয় অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে। ক্ষুদ্রাকৃতির এই নদীটি এখন অনেকটাই মৃত। ভাটির দিকে পানির প্রবাহ দৃষ্ট হলেও এনদীর উজানের অংশের অনেকটাই ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে। 

মুলত পাইকগাছা-কয়রা উপজেলার শতাধিক গ্রামের ৪৬ টি মৌজার পানি সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম মিনহাজ নদীর মূখে পলি জমা এবং ইজারাদারদের নেটপাটা পানির প্রবাহে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে ভরাট হওয়ায় এ অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। উক্ত প্রতিবন্ধতা দূরীকরণের লক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতিপূর্বে স্থানীয় এলাকাবাসী সহ লস্কর ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আরিফুজ্জামান তুহিন ২০১১ সাল থেকে বিগত দিনের এমপি, বর্তমানে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের সচিব, ডিসি ও ইউএনও সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করেছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি বলে তারা জানান। খুলনার পাইকগাছার লস্কর ইউনিয়নের মিনহাজ নদী অবস্থিত। সর্পিলাকার নদীর দৈর্ঘ্য ১৭ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ১২০ মিটার এরমধ্যে ২.৫২ একর জমি ইজারাকৃত। ফলে জলমহাল ইজারাদার কর্তৃক নেটপাটা দেওয়ার কারণে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গেল বর্ষার মৌসুমে অতি বৃষ্টির কারণে এলাকার পানি ঠিকমতো অপসারিত না হওয়ায় বাস্তবতার নিরিখে দেখা গেছে টানা ৩ দিনের বৃষ্টিতে ১৫ দিন লাগে মিনাজ নদীর পানি সরতে। এমনকি গত বর্ষার মৌসুমে গজালিয়া থেকে চাঁদখালী অভিমূখে পিচের রাস্তার উপর পানি উঠলে এলাকাবাসী মাছও ধরেছে-এই হলো অবস্থা।

মিনাজ নদীর পানি সরবরাহে ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী উক্ত ভরাট অংশ দ্রুত খনন করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা গেলে আগামী বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের এক লক্ষ বিশ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এমনিতে বিগত বছরগুলোতে এলাকার ধান ও মাছ চাষীরা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এলাকার প্রচুর রাস্তা, কাঁচা বাড়ীঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রাস্তা সংস্কার করা হলেও বন্যার পানি তোড়ে বারবার ভেঙে যাচ্ছে । সময় মতো বন্যার পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় এ অঞ্চলের স্কুল, কলেজ সহ সমস্ত অবকাঠামোর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । একেতো মিনাজ নদীর মুখের দিকের একটি বিশাল অংশ ভরাট হয়ে পানি সরবরাহে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে । 

অন্যদিকে বাইনতলা গেটটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় সমস্ত পানির চাপ এখন মিনাজ গেটের উপর।  প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত "গ্রাম হবে শহর" এ অঞ্চলে বাস্তবায়নে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্প গুলো টেঁকসই করার জন্য মিনাজ নদী সহ সকল পানি সরবরাহের ক্যানেল গুলো অবমুক্ত করা এবং টেঁকসই বেঁড়িবাঁধ তৈরী একান্ত প্রয়োজন। 

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আরিফুজ্জামান তুহিন জানান, লস্কর, চাঁদখালী, গড়ইখালী ও কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের ৯৫ টি গ্রামের ৪৬ টি মৌজায় এ নদীর পানির উঠা নামা করে। নদীর ভরাট হওয়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে না পারায় গোটা এলাকা প্লাবিত হয়। চরম ক্ষতির সম্মুূখীন হয় আমন চাষী, ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীরা। গত বছর ৯০% জমির ধানের ফসল ক্ষতি ও লক্ষাধিক  মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তিনি আরোও বলেন ইজারা বন্ধ ও নদী খনন না করা হলে এলাকাবাসী আরোও চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এব্যাপরে গড়ইখালী ইউপি চেয়ারম্যান আঃ সালাম কেরু বলেন, এলাকাবাসীদের বাঁচাতে নদী খননে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। 

চাঁদখালী ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাদা আবু ইলিয়াস বলেন, মিনহাজ নদীই একমাত্র উপায় যার পানি উঠা নামার মাধ্যমে কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। ইজারা বন্ধ করে নদী খননের মাধ্যমে কৃষক তথা এলাকাবাসীকে বাঁচাতে হবে। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে মিনহাজ নদীর চর ভরাটি অংশ খনন করা এখন সময়ের দাবী। চর ভরাটি অংশ, গজালিয়া নইল নদী, ধোপালী খাল, চাঁদখালী নদী সহ এলাকার পানি সরবরাহের ক্যানেল গুলো খনন করা না হলে এ অঞ্চলে জনদুর্ভোগ এড়ানো আদৌ সম্ভব নয়।  বিষয়টি বিবেচনা করে মিনহাজ নদীর চর ভরাটি অংশের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী, স্থানীয় এমপি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব সহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

পাঠকের মন্তব্য