রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আওতা বাড়ছে

লেখক; মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক

লেখক; মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক

মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার : সর্বশেষ ইউক্রেনের পশ্চিমা অস্ত্র–বহরে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি আসবেনা বলেছে। কিন্তু আসার সম্ভাবন ক্রমে প্রবল হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘকাল চললে সবাই হয়তো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
 
যুদ্ধের জেরে টানা তিন সপ্তাহ বন্ধ রাশিয়ার পুঁজিবাজার। যে যুদ্ধ তিন তারিখে শেষ করতে চেয়েচিলেন রাশিয়া তা আজ তের তারিখেও শেষ হয়নি। পরিস্থিতি জটিল স্তরে প্রবেশ করছে।
 
এটি হলো যুদ্ধের প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তর আরো জটিল হবে। দ্বিতীয় স্তর শুরু হবে কিয়েভের পতনের পর এবং ইউক্রেনে রাশিয়া সমর্থত সরকার বসার পর। তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে প্রবাসী সরকারে রূপান্তরিত করে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে চেষ্টা করবে।
 
যুদ্ধের প্রথম স্তরে কারো প্ল্যান কাজ করেনি। দ্বিতীয় স্তরেও কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। স্মরণ করা যেতে পারে আফগান-রাশিয়া যুদ্ধের কথা। ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রবেশের মধ্য দিয়ে সেই যুদ্ধ আরম্ভ হয়।
  
সে সময় সোভিয়েত সৈন্যরা আফগান রাজধানী কাবুলে পৌঁছানোর পর সোভিয়েতপন্থী বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় বসায়। তারপর শুরু হয় যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়। সোভিয়েত রাশিয়াকে ব্যস্ত রাখার জন্যে তারপর আমেরিকা শুরু করে আফগান মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ। আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে সেসময় প্রতিষ্ঠিত হয় হাজার হাজার মাদ্রাসা।
 
সে যুদ্ধ ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় নয় বছরের বেশি সময় ধরে চলে। রাশিয়ার নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন আফগানিস্তানে প্রায় ১,১৫,০০০ সৈন্য মোতায়েন করে, তাদের সাথে যুক্ত থাকে আফগানিস্তানের ৫৫,০০০ হাজার সোভিয়েত সমর্থিত সেনা।
 
সে যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে সমর্থন দেয় ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, ভারত, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও পোল্যান্ড। অন্যদিকে আফগানিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, মিশর, লিবিয়া, তুরস্ক, ইসরায়েল, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইরান। সমর্থন দিলেও যুদ্ধের ময়দানে সোভিয়েত রাহিনীর প্রতিকূলে থাকে শুধু মুজাহিদরা। টানা দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময়ের সে যুদ্ধে প্রায় ৬ থেকে ২০ লক্ষ আফগান প্রাণ হারায়, যাদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক।

সোভিয়েত সৈন্য মারা যায় প্রায় পনের হাজার, সোভিয়েত সমর্থিত আফগান সৈন্য মারা যায় প্রায় আঠারো হাজার। অন্যদিকে প্রায় এক লক্ষ মুজাহিদের জীবনের বিনিময়ে সোভিয়েত বাহিনী পরাজিত হয়ে ফিরে যায়। ফলাফলে দুই মেরুর পৃথিবীর এক বিশাল মেরু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পনের টুকরো হয়ে যায়। শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক এক মেরুর বিশ্ব। 

প্রায় তেত্রিশ বছর পর পৃথিবী সেরকম একটি প্ল্যানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আবারো। জানিনা সামনে কি হতে যাচ্ছে। তবে মানুষের দুর্ভোগ ছাড়া যুদ্ধ ভালো কিছু বহে আনতে পারবেনা। অধিকন্তু একটি দীর্ঘ যুদ্ধ বহনের ক্ষমতা বর্তমান পৃথিবীর মোটের উপর নেই।

লেখক; মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক।

পাঠকের মন্তব্য