ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আমাদের কি শিখতে হবে

মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক

মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক

মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার : কিয়েভ এখনো টিকে আছে। যেভাবেই হোক, যে থিউরিতেই হোক কিয়েভের পতন এখনো হয়নি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের পর আজ ঊনিশ দিন কিয়েভ টিকে আছে। 

অথচ ০১ মার্চ ইউক্রেনের খারকিভে অগণিত রুশ প্যারাট্রুপার নামানোর সাথে সাথে তীব্র বোমা হামলা শুরু করার পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আশা করেছিলেন, ৩ তারিখের ভিতরে কিয়েভের পতনের সাথে সাথে ইউক্রেনের ইতিহাস শেষ হয়ে যাবে। 

অর্থাৎ রুশ বাহিনীকে তিনি সময় দিলেন এক সপ্তাহ। সেই এক সপ্তাহ কিয়েভ টিকে ছিলো। তারপর রুশ প্রেসিডেন্ট সময় দিলেন পনের দিন। সেই পনের দিনও গত ১০ তারিখ শেষ হয়েছে। এখনো কিয়েভ টিকে আছে। তার মানে কি দাঁড়ালো ? কিয়েভ প্রতিরোধ যুদ্ধে টিকে আছে ? নাকি রুশ বাহিনী যুদ্ধের ট্র্যাপ থেকে বের হতে পথ খুঁজছেন ?

আমরা আগেই বলেছিলাম এই যুদ্ধের পক্ষ তিনটি। একটি হলো, স্বয়ং ইউক্রেন। দ্বিতীয় পক্ষ হলো রাশিয়া এবং তৃতীয় পক্ষ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তাঁদের মিত্র ন্যাটো জোট। এই তিন পক্ষের ভিতরে কার চাওয়া কি ? প্রথম পক্ষের জন্যে এটি তাঁদের মাতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ। তাই তাঁরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও মাতৃভূমি রক্ষার চেষ্টা করবে এবং তা তাঁরা করছে। 

দ্বিতীয় পক্ষ হলো রাশিয়া। তাঁরা তাঁদের নাকের ডগাতে ন্যাটোকে সম্প্রসারণ হতে দিতে চায়না। তাই তাঁরা ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদানে নিবৃত্ত রাখতে চায়। 

রাশিয়া সেজন্যে আহবান করে ইউক্রেন যেন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ না দেয়। কিন্তু ইউক্রেন রাশিয়ার পূর্বের অংশীজন হলেও বর্তমানে রাশিয়ার সাথে নিরাপত্তাবোধ করেনা। তার কারণ হলো, রাশিয়া ২০১৪ সাথে ইউক্রেনের প্রদেশ ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। এবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের আরো দুটি অঞ্চল দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। 

এই যুদ্ধের তৃতীয় পক্ষ হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং তাঁদের সামরিক জোট ন্যাটো। তাঁরা চায় কিয়েভের দ্রুত পতন ঘটুক। এই যুদ্ধে প্রথম থেকেই তাঁদের প্রবল আগ্রহ থাকলেও তাঁরা বলে আসছে ইউক্রেনের রণাঙ্গণে তাঁরা যুদ্ধ করতে আসবেনা, তবে তাঁরা ইউক্রেনকে সাহায্য দিতে প্রস্তুত এবং তাঁরা তা দিয়ে যাচ্ছেও। 

যুক্তরাষ্ট্র এবং তাঁদের মিত্র পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো চায় কিয়েভের পতন ঘটলেও ইউক্রেনে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলতে থাকুক। তাঁরা হয়তো পরিকল্পনা করে রেখেছেন এই কাজ জারি রাখতে কিয়েভের পতন হলেও ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে প্রবাসী সরকারে রূপান্তরিত করে ইউক্রেনে রাশিয়াকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আটকে রাখবেন। 

আমাদের ধারণা হলো, রাশিয়া এটি ধরে ফেলেছেন। এটি সত্য, তাঁরা যে চিন্তা করে ইউক্রেনে প্রবেশ করেছেন সে পরিকল্পনা কাজ করেনি। তাঁরা ভাবতে পারেনি ইউক্রেনের তাঁরা এত প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়বেন। তাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন জাতিতে প্রায় এক হওয়ার কারণে এবং পূর্বে ন্যাটোর বিকল্প শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশীজন হওয়ার কারণে ইউক্রেনের জনগণের একটি অংশ রুশ সেনাদের স্বাগত জানাবে।

তারপর রাশিয়া তাঁদের অনুগত একটি সরকার বসিয়ে ইউক্রেনকে ন্যাটো মুখী থেকে বিরত রাখবেন। সেটা যখন হয়নি তখন প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে আহবান জানালেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে। 

সেটাও যখন হয়নি তখন রুশ প্রশাসনের বুঝতে বাকী নেই সেই ১৯৭৯ সাথে সোভিয়েত কর্তৃক আফগানিস্তানে আক্রমণ এবং নয় বছর মুজাহিদদের সাথে যুদ্ধে আটকে থেকে সোভিয়েতের পনের টুকরো হওয়ার ইতিহাসের দিকে পশ্চিমারা তাঁদের নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর দেশগুলি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার কবলে বেঁধে ফেলেছেন রাশিয়াকে। 

রাশিয়া এই যুদ্ধ থেকে বের হতে চায় বলেই এখন পর্যন্ত তিনবার ইউক্রেনের সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে বৌঠকে বসেছেন এবং চতুর্থবারের মতো বসতে যাচ্ছেন। 

রাশিয়া দেখছেন, পশ্চিমারা তাঁদের মোট রিজার্ভ ৬৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার আটতে দিয়েছেন। তাঁদের মিত্রদের ইনএক্টিভ করে রেখেছেন এবং শত্রুদের এক্টিভ করে তুলেছেন।

সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র চীনকে হুশিয়ার করে দিয়েছেন তাঁরা যেন রাশিয়াকে কোনভাবেই সাহায্য না করে। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের যে, ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সব ধরণের সাহায্য দিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাঝেই চীনকে হুঁশিয়ার করেছেন, চীন যদি রাশিয়াকে কোন রকমের সামরিক সাহায্য দিতে চায় তবে তাঁদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। 

এই হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চীনের কি রেসপন্স দেখতে পাই ? চীন কিন্তু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেনি, চীন কার সাথে যাবে কি যাবেনা এটি চীনের সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। আমরা দেখতে পাই, চীন অত্যন্ত শালীনভাবে জানালেন তাঁরা রাশিয়াকে কোনরকম সামরিক সাহায্য দিতে যাচ্ছেন না। 

এর অর্থ কি দাঁড়ালো ? অর্থ দাঁড়ালো, ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সুপার পাওয়ারের শক্তি খর্ব হওয়ার পর পৃথিবী এখনো একমেরু কেন্দ্রিক শক্তিতেই চলছে। এটি সত্য যে, ইউক্রেন দখল করতে রাশিয়ার কোন দেশ থেকে অস্ত্র সাহায্যের দরকার নেই। রাশিয়া নিজেই পৃথিবী দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানীকারক দেশ। তাঁদের চীনের অস্ত্রের দরকার থাকার কথা নয়। 

যুক্তরাষ্ট্র এটি সামনে এনেছেন চীন যেন সেরকম চিন্তা না করেন, সেটা মনে করিয়ে দিতে। অথবা রাশিয়া চেয়েছিলো বিনিময়ের এই সম্পর্কে চীনকে রাশিয়ান ব্লকে এক্টিভ করতে। কিন্তু চীন জানে তাঁদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা ব্যবসা। চীন জানে তাঁরা এখনো সুপার পাওয়ার হয়ে উঠেনি। তাঁরা মূলত এখনো একটি আঞ্চলিক পাওয়ার। 

এই যুদ্ধ থেকে চীন চেষ্টা করছে সবচেয়ে বেশি লাভ উঠাতে। রাশিয়া দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অর্থকরী বিশ্বে নিষেধাজ্ঞায় আটকে থাকলে চীনের মাধ্যমে ব্যবসা করা ছাড়া তাঁদের গতি খুব কম। চীন অল্প দামে রাশিয়ান পণ্য কিনে রাশিয়ার বাজারে বেশি দামে বিক্রি করবে। ভারতও চাচ্ছেন রাশিয়ার এই আটকে যাওয়া মনোপলি মার্কেটে প্রবেশ করতে। 

আলোচনাতে সমাপ্ত না হলে এই যুদ্ধের ভবিষ্যত কি ? জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, এই যুদ্ধে কেউ জিতবেনা। এই মূল্যায়নকে মাথায় নিয়েও আমাদের মনে হয়, এই যুদ্ধে যদি কেউ জিতে তবে তা হলো ইউক্রেন। তাঁদের ভিতরে যে বিস্ময়কর জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে, এই যুদ্ধে তাঁরা জিতলেও জিতবেন, হারলেও জিতবেন। 

তাঁরা পৃথিবীকে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন, প্রাথমিক যুদ্ধে হারলেও তাঁরা তাঁদের ভূমি উদ্ধারে আজীবন লড়ে যাবেন। তাঁরা সভ্যতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কিয়েভ যখন রুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিলো তখন পৃথিবীতে মস্কোর নামও ছিলোনা। প্রাচীন এথেন্স নগরীর তুলনায় বর্তমান নিউইয়র্ক হয়তো মহীরুহ; কিন্তু এথেন্স, কিয়েভের কাছে নিউইয়র্ক, মস্কো ইতিহাসের কোন পর্যায়েই সমকক্ষ নয়। 

এই যুদ্ধ থেকে আমাদের শিক্ষনীয় কি ? আমাদের শেখার আছে, কোন একক সুপার পাওয়ার কিংবা আঞ্চলিক পাওয়ারের কাছেই ছোট রাষ্ট্রগুলো নিরাপদ নয়। তাই তাঁদের বাঁচার পথ তাঁদেরই বের করে রাখতে হবে। 

এটিতো সত্য যে, অস্ত্র উৎপাদন করে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় রাষ্ট্রগুলোর সাথে টিকতে পারবেনা প্রকৃতির অনিবার্য কারণে। তাহলে তাঁদের রক্ষাকবজ কি ? রক্ষাকবজ হলো কূটনীতি। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পারমানবিক বোমার অধিকারী হতে পারবোনা, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে যোগ্য এবং কার্যকরী কূটনৈতিক রাষ্ট্র হতে পারি। 

আমরা ইউক্রেন থেকে শিক্ষা নিতে পারি, কিভাবে একটি দুর্বল রাষ্ট্র হয়েই পৃথিবীর প্রায় সব অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তিকে নিজেদের পক্ষে এক্টিভ করে ফেলেছেন। এখানে হয়তো রাশিয়ার শত্রুরা একত্রিত হয়েছেন  কিন্তু ক্রিমিয়া দখলের পর তাঁরা বসে থাকেননি। তারা গোপনে গোপনে বন্ধু খুঁজেছেন এবং বন্ধুভাবাপন্নদের এক্টিভ করেছেন। 

আমাদের এখনো কোন শত্রু নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে যে'ই শত্রু হয়ে উঠুক তার বিকল্প শক্তি যেন আমাদের জন্যে এক্টিভ হয়ে উঠেন সে ব্যবস্থা আমাদের করে রাখতে হবে গোপনে গোপনে। প্রতিটি শক্তিকে ক্রশচেকে রেখে আমাদের প্রতিশক্তির সাথেও যোগাযোগ রাখতে হবে।  

প্রতিটি জাতি, কিংবা রাষ্ট্রকে মেরিট অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন ট্র্যাকে মাথায় রেখে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিরবিধি কাজ করে যেতে হবে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আমাদের নিরাপত্তার জন্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রলায়েও প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে।

লেখক; মুহাম্মদ গোলাম ছারওয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক।

পাঠকের মন্তব্য