অকৃতজ্ঞতা বা নিমকহারামি নিয়ে চমৎকার প্রাচীন গল্প

অকৃতজ্ঞতা বা নিমকহারামি নিয়ে চমৎকার প্রাচীন গল্প

অকৃতজ্ঞতা বা নিমকহারামি নিয়ে চমৎকার প্রাচীন গল্প

অকৃতজ্ঞতা বা নিমকহারামি নিয়ে চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি এরকম : একটা কচ্ছপ আর এক বিচ্ছু পাশাপাশি বাস করত। একে অপরের প্রতিবেশী। দীর্ঘদিন ধরে একত্রে বসবাস করতে করতে তাদের মাঝে অনেকটা কাছের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল।

একজন আরেকজনকে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেল। কিন্তু পরিচিতি আর বন্ধুত্ব কি এক কথা ? গ্রামে কিংবা শহরে কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করলে মুখগুলো তো প্রায় চেনা হয়ে যায়। চেনা মুখ দেখতে দেখতে আপনও মনে হয়। কিন্তু তাই বলে কি সবাই বন্ধু হয় ? হয় না।

যাই হোক, কচ্ছপ আর বিচ্ছুর বসবাসের এলাকায় একদিন তাদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ একটা ঘটনা ঘটে গেল। সুতরাং সেখানে তো বসবাস করাটা ঠিক নয়। তাই তারা ওই এলাকা ছেড়ে যাবে বলে ঠিক করল। কচ্ছপ আর বিচ্ছু তাই আগপাছ না ভেবেই রওনা দিল একসাথে। কিন্তু কোথায় যাবে কিছুই জানে না। আপন ভিটে ছেড়ে তারা নিরুদ্দেশে পাড়ি জমালো। যেতে যেতে তাদের সামনে পড়লো একটা নদী। বিচ্ছু তো নদীর দিকে তাকিয়ে হতাশায় স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কচ্ছপকে বলল দেখেছ! কী দুর্ভাগ্য আমার! কচ্ছপ বলল কেন কী হয়েছে। দুর্ভাগ্য বলছো কেন? বিচ্ছু বলল সামনে নদী! অথৈ পানি। আমি এখন না সামনে যেতে পারব, না পেছনে। যদি সামনে যাই নদীর পানিতে ডুবে মরব। আর যদি পেছনে যাই তাহলে তোমার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাব।

কচ্ছপ বলল চিন্তা কর না বন্ধু ! সামনে যত বিপদই আসুক কিংবা যত সুযোগই আসুক সবকিছুই সমানভাবে ভাগ করে নেব, ঠিকাছে। আমি তোমাকে নিরাপদে নদী পার করিয়ে দেব, চিন্তা কর না। তুমি আমার পিঠে চড়ে বসো! আমি পানিতে ভেসে ভেসে নদী পাড়ি দেব আর তুমি আমার পিঠে বসেই চলে যাবে। বন্ধু তো সে-ই যে বিপদে বন্ধুর হাত ধরে, তাই না! কচ্ছপ বলল আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। হে বিশ্বস্ত বন্ধু আমার। আমি কোনোদিন সুযোগ পেলে তোমার এই বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করার চেষ্টা করব।

এই বলে বিচ্ছু কচ্ছপের পিঠে চড়ে বসল। কচ্ছপও সাঁতরাতে সাঁতরাতে পাড়ি জমালো নদীতে। নদীর পানির ওপর দিয়ে আরামে যাচ্ছিলো বিচ্ছু। কোনোদিন কল্পনাই করতে পারে নি সে এভাবে নদী পার হবে। আহা! কী যে আনন্দ লাগছে তার। কচ্ছপও বন্ধুকে পিঠে নিয়ে আনন্দে ভাসতে লাগলো নদীর পানির ওপর। ভাসতে ভাসতে হঠাৎ তার মনে হলো পিঠে যেন কেমন নখের আঁচড়ের মতো লাগছে। বিচ্ছুকে জিজ্ঞেস করল পিঠে বসে কী করছো? কেমন যেন আঁচড় টানার শব্দ পাচ্ছি! আসলে কীসের শব্দ ওটা? বিচ্ছু জবাব দিল: তেমন কিছু না। চেষ্টা করছি একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করতে। কচ্ছপ আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইল কেন, কী করবে? বিচ্ছু বলল কেন বুঝতে পারছো না! তোমার গায়ে হুল ফোটাতে…।

কচ্ছপ বিস্মিত হয়ে বলল: এই নিমকহারাম! নির্দয় বে-ইনসাফ! আমি আমার জীবনের মায়া ত্যাগ করে তোকে মহাবিপদ থেকে বাঁচাতে নদী পাড়ি দিলাম। তোকে সম্মানের সাথে আমার পিঠে বসালাম, আর তুই এই তার প্রতিদান দিলি? আমাকে হুল ফুটাতে চাচ্ছিস! ছি ছি ছি..! শোন! তুই যত চেষ্টাই করিস আমার গায়ে হুল ফুটাতে, কোনো লাভ হবে না.., পারবি না তুই। আর আমাকে কামড় দিয়েও কোনা কাজ হবে না। তোর কামড়ের কোনো প্রভাব আমার ওপর পড়বে না। কিন্তু আমি ভীষণ আশ্চর্য হচ্ছি, তুই এরকম অকৃতজ্ঞতা কেন দেখালি? কেন তুই খেয়ানত করলি। আমাকে মারতে চাইলি কী কারণে?

বিচ্ছু বলল দেখ বন্ধু! সবকিছুরই একটা স্বভাব প্রকৃতি আছে। আগুনের বৈশিষ্ট্য হলো পোড়ানো। শুধু পোড়ানো। বন্ধু কিংবা স্বজন পরিজনের গুরুত্ব তার কাছে নেই। তার কাজই হলো পোড়ানো। তাই সে সবারটাই পোড়ায়। আমারও নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য আছে। তা হলো হুল ফোটানো বা কামড়ানো। এমনিতে তোমার সাথে তো আর আমার কোনো শত্রুতা নেই, না তুমি আমার কোনো ক্ষতি করেছো বরং নিজের জীবন বাজি রেখে আমাকে নদী পার করাচ্ছো। আমরা পরস্পর বন্ধু-ছিলাম, আছি এবং থাকবো। শোনেনি.. বিচ্ছুর কামড় প্রতিহিংসার জন্য নয়, এটা তার স্বভাব। কচ্ছপ বিচ্ছুর কথায় সায় দিয়ে বলল হ্যাঁ বন্ধু! তুমি ঠিকই বলেছ! তোমার তো কোনো দোষ নেই, দোষটা আসলে আমারই। বিচ্ছু আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইল তোমার আবার কী দোষ, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! একটু খুলে বলবে?

কচ্ছপ বলল হ্যাঁ বলছি! আমার দোষটা হলো এতো এতো প্রাণী থাকতে আমি কেন তোমার মতো একটা অকৃতজ্ঞকে বন্ধু হিসেবে বেছে নিলাম.. সেটাই আমার দোষ। আমি যতই তোমার উপকার করবো, তোমার ভালো চাইবো, তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবো.. তুমি তোমার স্বভাব প্রকৃতি অনুযায়ী হিংস্র আচরণই করবে আমার সাথে। তাই বন্ধু! তোমার সাথে আর দোস্তি করে কাজ নেই। তোমার মতো বন্ধু থাকার চেয়ে বন্ধুহীন নিঃসঙ্গ থাকাটা অনেক অনেকগুণ ভালো। বুঝতে পেরেছো দোস্ত…! বিচ্ছু এবার আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করল....... না, মানে… তুমি ঠিক কী বলতে চাইছো… এই মাঝনদীতে… বিচ্ছুর কথা শেষ হতে না হতেই কচ্ছপ বলল জীবনে তো অনেক বুঝেছো.. আর বুঝে কাজ নেই… এই বলেই কচ্ছপ একটা দোল দিয়ে বিচ্ছুটাকে তার পিঠ থেকে নদীর পানিতে ফেলে দিলো।

পাঠকের মন্তব্য