সৌন্দর্য চর্চায় কপালের টিপ এবং বিজাতীয় বিরোধীতা

সৌন্দর্য চর্চায় কপালের টিপ এবং বিজাতীয় বিরোধীতা

সৌন্দর্য চর্চায় কপালের টিপ এবং বিজাতীয় বিরোধীতা

কয়েকদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মহিলাদের কপালের টিপ নিয়ে যথেষ্ঠ টিপ্পনি চলছে। এ টিপ্পনিগুলোর প্রতি সাড়াদানকারীদের একটি বড় অংশ আবার মহিলা। বলা হচ্ছে যে, কপালের টিপ পরা পুরোমাত্রায় হিন্দুয়ানী বিষয়। তাই মুসলমান নারীদের জন্য টিপ পরা একদম হারাম। 

কেউ কেউ বলছেন, এটা আসলে হিন্দু মেয়েদের সিঁদুর পরারই একটি ব্যত্যয়। তাই মুসলমান মেয়েরা টিপ পরলে হিন্দু হয়ে যাবেন। আর এ জন্য রীতিমত ইহকাল পরকালে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। আবার এ টিপ পরার গোড়ার কাহিনী হিসেবে তুলে আনা হয়েছে নমরুদ কর্তৃক হযরত ইব্রাহিম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপ করার কাহিনী।
 
সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে দেখা যায়, ঐ সব মিডিয়ার লেখাগুলো গোঁড়া মতালম্বীদের। সব লেখা বা পোস্টের উৎস একটাই। কোন এক সময় কোন এক গোঁড়া মতালম্বী ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে মেয়েদের কপালে টিপ পরা হারাম, আর যায় কই ! অন্যরা সেটা নকল বা কপি করে করে নিজের মতো করে সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা ভরাচ্ছেন। 
  
ঐ সব লেখায় বলা হচ্ছে, হযরত ইব্রাহিম (আ) -কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য আট মাইল লম্বা কুণ্ড সাজানো হয়, তখন প্রজ্জ্বলিত আগুনের শিখার তাপ এতদূর ছড়িয়ে পড়ে যে সেখানে ইব্রাহিম (আ) কে ধরে ছুড়ে মারা নমরুদের লোকজনের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। তাই, শয়তানের পরামর্শে নমরুদ একটা গুলতির মতো ছুড়ে মারার যন্ত্র বা চরকা তৈরি করল যেখানে ইব্রাহিম (আ) কে বসিয়ে গুলতির মতো ছুড়ে মারা হবে। কিন্তু ঐ গুলতিকে রহমতের ফেরেস্তারা টেনে ধরে থাকায় গুলতি কাজ করছিল না। তখন নমরুদ কিছু পতিতা বা খারাপ চরিত্রের মেয়েকে উলঙ্গ অবস্থায় গুলতির আসেপাশে জড়ো করে। এতে রহমতের ফিরিস্তারা পালিয়ে যায় এবং ইব্রাহিম (আ)-কে নমরুদ আগুনে ছুড়ে মারতে সমর্থ্য হয়। এখন ঐ পতিতা মেয়েদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে নমরুদ তাদের কপালে টিপ পরিয়ে দেয়। এখন মেয়েদের কপালের টিপ হল, সেই নষ্টা মেয়েদের মর্যাদারই প্রতীক। 
 
এবার আসুন,জানার চেষ্টা করি- কপালের টিপ সম্পর্কে মোল্লাদের এমন গল্প কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য। মুসলমানদের জন্য যায়েজ না-জায়েজ তথা ধর্মীয় বিধানের প্রথম ও প্রধানতম উৎস হল পবিত্র কোরআন। কপালে টিপ পরা না-জায়েজ সম্পর্কিত গল্পের সূত্র হিসেবে দেয়া হয়েছে তাফসীরে মা-রেফুল কুরআন, কাসাসুল আম্বিয়া, কিংবা ইবনে কাসির রচিত আদি ইসলামী ইতিহাস। বলাবাহুল্য, এসব সূত্রের কোনটিই প্রামাণ্য নয়। 

আমাদের মনে রাখতে হবে- তাফসির আর পবিত্র কোরআন এক জিনিস নয়। পবিত্র কোরআন অপরিবর্তনীয়। কিন্তু তাফসিরের ব্যাখ্যা বা বর্ণনায় যথেষ্ট ভিন্নতা থাকে। এমনকি একই ঘটনা বা বিষয়ের উপর একইকালে রচিত তাফসিরে পরষ্পর বিরোধী ব্যাখ্যাও রয়েছে।  

হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২৫টি সূরায় ২০৪টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। নানা বিষয়ের মধ্যে এখানে হযরত ইব্রাহিম (আ)-কে জনৈক শাসক কর্তৃক আগুনে নিক্ষেপ করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু কোরআনের কোন স্থানেই সেই শাসকের নাম বলা হয়নি। তার মানে হচ্ছে নমরুদ নামের কোন ব্যক্তির কথা কোরআনে উল্লেখ নেই। তাহলে নমরুদের নাম আসল কিভাবে ? হ্যাঁ, এ নাম এসেছে ইসরাইলী বা ইহুদি সূত্রগুলো থেকে। তাই জোর দিয়েই বলা যায়, নষ্টা মেয়েদের দিয়ে রহমরে ফিরিস্তা তাড়ানো কিংবা সেই সব নারীদের কপালে টিপ পরানোর কাহিনী কোরআনে বর্ণিত কোন কাহিনী নয়। এগুলো আরব অঞ্চলের উপকথা কিংবা ইসরাইলি বা ইহুদিদের মিথ বা পুরাণ। কিন্তু আমাদের স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন মোল্লারা কোরআনের বর্ণনাকে পাশ কাটিয়ে ইহুদি সূত্র দিয়ে আমাদের নারীদের কপালের সৌন্দর্য-বিরোধী প্রচারণায় নেমেছেন।

আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। কোরআনে হযরত ইব্রাহিমের (আ) নমরুদ কর্তৃক আগুনে নিক্ষেপের কথা বলা আছে। কিন্তু তবে নিক্ষেপ করার ক্ষেত্রে নমরুদের প্রযুক্তিগত বিভ্রান্তির কোন বর্ণনা তো দূরের কথা এর কোন ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই। অন্য দিকে কাসাসুল আম্বিয়া একটি জনপ্রিয় পুঁথি বই কিছু নয়। এ বইয়ে নবী-রাসুল-আউলিয়াদের সম্পর্কে অনেক কথাই বলা আছে যেগুলো সাধারণ যুক্তিতেও টেকে না। তাই কপালের টিপ সংক্রান্ত নমরুদীয় কিচ্ছাটা যুক্তিবাদী মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলামী বিধিবিধানের দ্বিতীয় উৎস হল, হাদিস বা মহানবীর (স) এর কথা কাজ বা অনুমোদন। কিন্তু কপালে টিপ পরা হারামকারী হুজুরদের ভাষ্যে মেয়েদের কপালের টিপ পরার উপর কোন হাদিসেরই উল্লেখ নেই।  এর কারণ হল, মহানবী(স) সাধারণত সমসাময়িক সমস্যাবলীর উপরই সমাধান বা সিদ্ধান্ত দিতেন। কিন্তু সেই সময় তো নয়ই বরং বর্তমান সময়ও কোন আরবি নারী যে টিপ পরেছিলেন বা টিপ পরার কথা জানতে পেরে তার ব্যবহার সম্পর্কে মহানবীর (স) সিদ্ধান্ত জানতে চাইবেন- এমন কোন ঘটনার উদ্ভবই হয়নি। এছাড়াও হযরত ইব্রাহিমকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার কাহিনীর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েও তেমন কোন সহিহ হাদিস নেই। এ সম্পর্কে সহিহ হাদিসটি হল যে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় হযরত ইব্রাহিম (সা) প্রার্থনা করেছিলেন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না সুন্দর তত্ত্বাবধায়ক’। তাই যে গল্প বা শ্রুতি মহানবীর (স) জীবদ্দশায় চালুই ছিল না, তাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই বটে।

এবার আসি  সৌন্দর্য চচ্চা হিসেবে কপালে টিপ পরা প্রসঙ্গে। ভারত উপমহাদেশে আদিকাল থেকেই টিপ পরার বিষয়টি প্রচলিত ছিল। কপালের টিপ যে কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক তা নয়, এটা বিজয় বা গৌরবেরও প্রতীক। প্রাচীন রাজ-রাজড়াগণ তাদের রাজবংশের প্রতীক হিসেবে বিশেষ ধরনের টিকা পরত। কপালের টিপ বা টিকা দেখেই বোঝা যেত ঐ ব্যক্তি কোন রাজপরিবারের বা রাজ্যের মালিক বা উত্তরাধিকার। 

জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহীর’ প্রথম স্তবকেই পাঠক পাবেন– ‘মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!’। অন্য দিকে বাংলা-ভারত ভূখণ্ডের মাটির নিচে যে সব পুরাকীর্তির মূর্তি পাওয়া গেছে তাদের অনেকগুলোর কপালেই টিপ পরানো ছিল। এর অর্থ হচ্ছে কপালের টিপ পুরোমাত্রায় একটি বঙ্গভারতীয় রীতি, সংস্কৃতি বা প্রতীক (Symbol)। এর সাথে মধ্য প্রাচ্যের বা আরবের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।

এখন অনেকে বলবেন, মধ্য প্রাচ্যের এই প্রথা ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়েছে। তাই এটা পাচার হয়ে এসেছে ভারত ভূখণ্ডে। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বের পুরাকীর্তিতে যখন টিপ বা টিকা পরানোর আলামত আছে, তার ব্যাখ্যা কী? খ্রিস্ট জন্মের পূর্বে আলেকজান্ডারের ভারত দখলের ইতিহাস আছে। কিন্তু আরবগণ অষ্টম শতকের (৭১২ সাল) এর পূর্বে ভারত বা ভারতের কোন অংশ দখল করেছিল এমন কোন ইতিহাস নেই।  

তাই আরবীয় নষ্টা নারীদের কপালের টিপ ভারতে, বিশেষত বাংলায় আসার কোন কারণই নেই। তাই নমরুদের ঘটনার সাথে বঙ্গভারতীয় নারীদের কপালের টিপ পরার অনুসঙ্গ টেনে আনা ভ্রান্ত বিশ্বাস বা পুরাকাহিনীর নব আবিষ্কার হতে পারে, ঐতিহাসিক ঘটনা হতে পারে না। মেয়েদের অলঙ্কার পরার যারা বিরোধিতা করেন, তারা কোন প্রকার মিথ্যা ঘটনা না সাজিয়েই তা করতে পারেন। কিন্তু কেউ যখন ইহুদি সূত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বাঙালি নারীদের সৌন্দর্যচর্চার বিরোধিতায় নামেন, তাদের কি নামে অবহিত করব?

কপালের টিপ পরা সম্পর্কিত মোল্লাদের ফতোয়া স্থূল স্ববিরোধীতায় পরিপূর্ণ। যা কিছু সৌন্দর্য বর্ধন করে তার পিছনে মোল্লাদের ফতোয়া যাই থাকুক না কেন, মানুষ এ চর্চা অব্যাহত রাখবে সেটা না বললেও চলে। তবে আমাদের মোল্লাদের আপত্তি কিন্তু পুরুষদের সৌন্দর্য বিষয়ে খুবই নমনীয়। তাদের যত আপত্তি ঐ মেয়েদের নিয়েই। ইংরেজদের কোট-প্যান্ট-টাই কিংবা ইহুদিদের জোব্বায় কিছু আসে যায় না। কেবল আপত্তি হল মেয়েদের নিয়েই। বাঙালি পুরুষরা চাইলে যে কোন পোশাক পরতে পারে। কিন্তু মেয়েদের কালো রোরখা না পরলে ধর্ম-কর্ম কিছুই থাকে না। কিন্তু তারপরও আমাদের মেয়েরা কপালে টিপ পরবে।

লেখক- মোঃ আব্দুর রাজ্জাক 
ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান
  

পাঠকের মন্তব্য