আশার আলো দেখাচ্ছেন গলাচিপার GEE গ্রুপের উদ্যোক্তারা

আশার আলো দেখাচ্ছেন গলাচিপার GEE গ্রুপের উদ্যোক্তারা

আশার আলো দেখাচ্ছেন গলাচিপার GEE গ্রুপের উদ্যোক্তারা

নদী বেষ্টিত পটুয়াখালী জেলার গলাচিপায় বেকার তরুণ-তরুণীদের মনে আশার প্রদীপ জ্বালাতে ও নিজ প্রচেষ্টায় স্বাবলম্বী করতে "স্বপ্ন বুনি, সমাজ সাজাই " এই স্লোগান নিয়ে কাজ করছে ফেইসবুক ভিত্তিক অনলাইন Galachipa E-Commerce & Entrepreneurs (GEE) গ্রুপ। 
 
স্বল্প পুঁজিতে ঘরে বসে ব্যবসার সুযোগ থাকায় দেশজুড়ে বাড়ছে অনলাইন উদ্যোক্তার সংখ্যা। তেমনি পিছিয়ে নেই উপকূলীয় প্রত্যন্ত অঞ্চল গলাচিপা। প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজের একটা পরিচয় তৈরিতে ব্যবসায় নিয়ে ব্যস্ত GEE গ্রুপের উদ্যোক্তারা। করোনাকালে ঘরে বসে পণ্য পেতে ক্রেতাদের যেমন অনলাইন ভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও ফেইসবুক পেজ-গ্রুপের প্রতি নির্ভরশীলতা বেড়েছে, তেমনি অনলাইন ব্যবসায় অনেক উদ্যােক্তার বেড়েছে আগ্রহ। সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিজেদের সততা ও ক্রেতাদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে অনেকেই অনলাইন বিজনেস খুলে বসেছেন। অনলাইনে ব্যবসা বাণিজ্যকে সম্প্রসারণ করে নিজেই হয়ে উঠছেন স্বাধীন উদ্যোক্তা।

বর্তমানে গলাচিপায় জমজমাট হয়ে উঠেছে অনলাইন ব্যবসা। গলাচিপা উপজেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেন তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে এবং দেশজুড়ে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলতে পারে সেই লক্ষ্যেই স্বপ্নবাজ মো. সুমন শুভ ২০২১ সালের ১৪ আগস্ট গলাচিপাবাসীর জন্য Galachipa E-Commerce & Entrepreneurs (GEE) নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ ক্রিয়েট করেন সাথে কাজ এগিয়ে নিতে যুক্ত করেন স্বপ্নচারিনী তারান্না তান্নুম লিজাকে। 

এ ফেসবুক গ্রুপকে কেন্দ্র করে উপজেলা থেকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। বর্তমানে গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৬০০। এখন পর্যন্ত গলাচিপা শহরে এটিই একমাত্র জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস যেখানে একসাথে প্রায় ৫০ জন উদ্যোক্তা নিজেদের পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে এ গ্রুপ নিয়ে ক্রেতা ও উদ্যোক্তামহল বেশ সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। এছাড়া উদ্যোক্তাদের পণ্য ডেলিভারি করতে GEE গ্রুপের রয়েছে নিজস্ব জি-ফেরিওয়ালা। এ কাজ সম্পন্ন করতে আলমগীর হোসাইন, রিপন সাহা, ফারদিন ইসলাম সবসময় নিবেদিত। 

পেজ ক্রিয়েটর ও এডমিন মো. সুমন শুভ জানান, করোনাকালীন সময়ে যখন সবাই ঘর বন্দী তখন সবাই কিন্তু আমরা ই-কমার্স এর দিকে ঝুঁকে পড়ি। চারপাশে দেখছিলাম অনেকেই অনলাইন থেকে বেচা-কেনা করছে। আমি খেয়াল করি গলাচিপার অনেকেই ই-কমার্স ভিত্তিক কাজ করছে কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট কোন প্ল্যাটফর্ম নেই, যেটার মাধ্যমে সবাই তাদেরকে সহজেই জানতে পারবে, চিনতে পারবে৷ সবার জন্য কমন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার ইচ্ছা থেকেই গলাচিপা ই-কমার্স এন্ড এন্টারপ্রেনার গ্রুপটি খোলা এবং তার কিছু দিন পরে তারান্না তান্নুম লিজা আপুকে এডমিন করি এভাবে আমাদের পথ চলা শুরু হয়। আমাদের একটাই লক্ষ্য জেলার মধ্যে গলাচিপা উপজেলার ই-কমার্স কে উন্নত করা৷

গ্রুপের ক'জন সফল উদ্যোক্তার সাথে কথা বললে তারা জানান, তাদের উদ্যােক্তা হওয়ার গল্প -

ইয়ামিন হোসেন নিশরাতের "Nishrat's Homemde Food"
 
গৃহিনী নিশরাত তার উদ্যােক্তা হওয়ার গল্পে বলেন, স্বামীর সংসারে রান্না দিয়ে মন জয় করেছি সকলের। সবার প্রশংসায় মনে ইচ্ছে জাগে রান্না নিয়ে কিছু করার। এক প্রকার শখ ছিলো বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন রেসিপি রান্না করা। তবে রান্না নিয়ে ব্যবসা লোকে কি বলবে এটা ভেবে উদ্যোগে নিতে সাহস করিনি। তবে যখন দেখি অনেকেই ঘরে বসে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছে তখন আর থেমে থাকিনি শুরু করলাম হোম মেইড ফুড দিয়ে কাজ। নিজের নামে পেইজ খুলে ব্যবসা শুরু করলেও তেমন সারা না পাওয়ায় এক প্রকার হতাশ হলাম। হটাৎ একদিন দুই প্যাকেট বিরিয়ানির অর্ডার দিতে মো. সেলিম আহমেদ নামে একজন নক করেন। ৪৫০ টাকার অর্ডার ছিলো অনেক ভয় ও উৎসাহ নিয়ে কাজটা কমপ্লিট করি পরে রিভিউ অনেক ভালো পেয়েছিলাম এভাবেই কাজের শুরু। 

দু'জনের খাবার দিয়ে শুরু করে আল্লাহর রহমতে এখন ৫০ থেকে ১০০ জনের জন্য খাবার তৈরি করছি। হোম মেইড খাবার এর পাশাপাশি তৈরি করছি কেক। মাসে ১৫ থেকে ২০ টাকার অর্ডারও আসে। ই-কমার্স GEE এর সাথে পরিচয়টা ব্যবসা শুরুর বেশ কয়েক মাস পরে তবে এখানে যুক্ত হয়ে খুব অল্প সময়ে আমার পরিচিতি বেড়ে যায় অনেক টা যেটা কখনও কল্পনাও করতে পারি নি। GEE গ্রুপ থেকে ভালো পরিচিতি পেয়েছি এডমিনদের ভালবাসা পেয়েছি। সমানে সবার সাথে মিলে গ্রুপ কে আরো বড়ো করবো এবং গ্রুপের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশজুরে সাথে আমার নিজের পরিচিতি আরো বাড়বে এমনটাই পত্যাশা।

মুসফিকা রহমান ঐশীর "জল ফড়িং কারুশিল্প"

স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী ঐশী বলেন, ছোটবেলা থেকেই আর্টের প্রতি আলাদা দূর্বলতা ও ভালোবাসা কাজ করতো। হাতের কাছে যা পেতাম তার ওপরে নানা ধরনের পেন্সিল স্কেচ করতাম। ছোট থেকেই পেইন্টিং এর উপর অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করতো। যখন বড় হোলাম সোশ্যাল মিডিয়াতে হ্যান্ড পেইন্ট নিয়ে কাজ করতে দেখি তখন থেকে আমার ইচ্ছে জাগে হ্যান্ড পেইন্ট নিয়ে কাজ করার। পড়াশোনার পাশাপাশি তাই ইচ্ছে, স্বপ্ন ও ভালোবাসা থেকে কাজ শুরু করি।

চলার পথে (GEE) গ্রুপের সাথে পরিচয়। দিনে দিনে পরিচয়টা সম্পর্কে নেয় এক অমৃত ভালোবাসায়। আমার উদ্যোক্তা জীবন শুরু থেকে এই গ্রুপে আমি আছি আর প্রথম কাস্টমার হিসেবে পেয়েছি গ্রুপ এডমিন লিজা আপুকে। তার ভালোবাসা ও সহায়তা কাজ করতে অনুপ্রেরণা যোগায়। 

আমার কাজ করাটা ছিল শখের বশে তাই কত ইনকাম হল বা লস হলো এটা নিয়ে আমি চিন্তা করিনি কখনো। আমি সম্পূর্ণ কাজটা করি মন থেকে ভালোবেসে। সব থেকে বড় কথা হলো আমার বড় আপু সবকিছুর মূল ও না থাকলে আমি কখনোই আমার কাজে সফল হতে পারতাম না ধন্যবাদ দিতে চাই আমার আপুকে কারণ ও না থাকলে কখনোই আমার এত দূরে আশা হতো না। 

নুসরাত জাহান ইলার "Style Creation"

ইলা বলেন, পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর'। নারী ও পুরুষকে এভাবেই দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বর্তমানে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই। তারা তাদের নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঘরে বাইরে সব পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। অনলাইন ব্যবসায়ের প্রবর্তনের ফলে নারীরা আরও বেশি পরিমাণে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হচ্ছে। তাদেরই একজন হতে আমি কাজ করছি থ্রিপিস, শাড়ি, বেড সিট নিয়ে।

বাবার স্বপ্ন ও হাজবেন্ডের অনুপ্রেরনায় অনলাইনে নারীদের পণ্য নিয়ে ব্যবসার শুরু। নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ থেকে দু'বছর আগে ৫,০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তার ব্যবসায়ের মূলধন বহুগুণে বেড়েছে। নিজস্ব পরিমণ্ডলে তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। তার পণ্যের দাম ও মানের কারণে অনলাইনের পাশাপাশি নিজ এলাকায় তিনি সাধারণের কাছে অল্প সময়ে ভালো অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি মনে করেন, একজন উদ্যোক্তার প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো স্বপ্ন দেখা। একজন ব্যবসায়ী ও একজন উদ্যোক্তার মধ্যে এটাই পার্থক্য। স্বপ্নবাজ নুসরাত জাহান ইলা তার মনের লালিত স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে বন্ধুদের ও (GEE) থেকে বিশেষ সহোযোগিতা পেয়েছে বলে জানান।

গলাচিপা ই-কমার্স এন্ড এন্টারপ্রেনার গ্রুপের এডমিন ও উদ্যোক্তা তারান্না তান্নুম লিজা বলেন, করোনার শুরুর দিকে বাসায় বেকার সময় কাটাতাম। ফলে বেকার সময়কে কাজে লাগাতে নিজ উদ্যোগে "Safia Spices "নামে ফাস্টফুড নিয়ে কাজ শুরু করি। যা পরবর্তীতে "ঘরোয়া" নামে পরিচিতি লাভ করে। সেখান থেকেই শুরু অনলাইন প্লাটফর্মে পথচলা এবং আমিই প্রথম গলাচিপার অনলাইন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা। ঘরে তৈরি ঘি, সিংগারা, চালের রুটি সহ নানা খাবার নিয়ে আমার কাজ। তবে চালের রুটি সবার পছন্দের তাই অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা পায়। তবে ইচ্ছে ছিলো গলাচিপার মানুষের জন্য কিছু করার। তাই সেই ভাবনা থেকে গতবছর করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মো. সুমন শুভ এর সাথে মিলে কাজ শুরু করি Galachipa E-commerce & Entrepreneurs নামের এই গ্রুপে।

লক্ষ্য বা উদ্দ্যেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, গলাচিপার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাগুলো তুলে আনতে কাজ করছেন তারা। প্রতিভার বিকাশ এবং গলাচিপা শহরকে সবার কাছে পরিচিত করে তোলা তাদের উদ্দেশ্য। পথচলাটা খুব যে একটা সহজ না তাও বললেন এই উদ্যোক্তা। তবে হাল ছাড়তে রাজি নন। গ্রুপের ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের হাত ধরে সাফল্যে অর্জনে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। 

জানা যায়, এক হাজার সদস্য পূর্তি উপলক্ষে গেটটুগেদার করেছে GEE সদস্যরা। উদ্যোক্তাদের নিয়ে নিয়মিত মাসিক সভা, উদ্যোক্তা মেলার মত আয়োজন করেছেন তারা। দুচোখ ভরা স্বপ্ন আর বিশ্বাস নিয়ে তাই সরকারের কাছে আবেদন করলেন উপজেলা পর্যায়ের ছোট উদ্যোক্তাদের পণ্য যাতে সারা বাংলাদেশে অনায়াসে পৌঁছাতে পারে তার জন্য সহজ ও নিরাপদ কুরিয়ার সার্ভিস সেবা। সুযোগ পেলে বেড়ে উঠা শিক্ষার্থীরা সব প্রতিবন্ধকতা ভেঙ্গে নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারবে বলে বিশ্বাস তার। 

পাঠকের মন্তব্য