গণহারে ইসলামী বক্তাদের তালিকা তৈরীর মানে কি ?    

সজল রোশন

সজল রোশন

জঙ্গি অর্থায়ন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের দায়ে ১১৬ জন "ধর্ম ব্যবসায়ীর" একটি তালিকা দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিয়েছে ‘গণকমিশন’। এ তালিকায় দেশের প্রায় সকল জনপ্রিয় ইসলামী বক্তার নাম আছে। "গণকমিশন" ধর্ম ব্যবসা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে তা আমার কাছে পরিস্কার নয়। 

একজন ইসলামী বক্তা ওয়াজের জন্য যে সম্মানী নেন, মসজিদ-মাদ্রাসা বা এতিমখানার জন্য যে ডোনেশান নেন—তা অপরাধ বা বেআইনি কিছু নয়| এর জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা, সমালোচনা, ট্রল করা গেলেও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নাই। কোরআন-হাদীস মোতাবেক ধর্ম প্রচারের বিপরীতে টাকা নেয়ার বিধান বা ফতোয়া দেয়ার এখতিয়ার,যোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কোনোটাই দুদক এবং এই স্বঘোষিত "গণকমিশনের" নাই।

নাটক, সিনেমা, গানের কনসার্টের মতোই ওয়াজ, মাহফিলেরও বাজার আছে। একমাত্রা, বিদ্যানন্দের যেমন ডোনার আছে; হাফেজি মাদ্রাসা, এতিমখানা, দরবার শরীফে দান করার লোকও আছে| কে কোথায় দান করবে তা দুদক বা গণকমিশন ঠিক করবে ন। যার টাকা সে ঠিক করবে। (জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা আছে, বিচারিক প্রক্রিয়া আছে)    
 
এজন সংগীতশিল্পী তার জনপ্রিয়তা বা বাজারদর অনুযায়ী সম্মানী নিতে পারলে একজন ওয়ায়েজিন কেন পারবেন না ? একজন বক্তার সম্মানী ঠিক হয় চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে। ইসলামিক, অনৈসলামিক, ডাক্তার, মোক্তার, মোটিভেশনাল স্পিকার সবার বেলাতেই এ কথা প্রযোজ্য। বাজার অর্থনীতির এ চিরন্তন নিয়মে হস্তক্ষেপ করলে বাজারের শক্তি সে অযাচিত হস্ত গুড়িয়ে দিবে।   

আমির-সালমানদের সম্মানী যেমন তাদের চাহিদার ভিত্তিতে ঠিক হবে আজহারী-আব্বাসীদের সম্মানীও তাদের চাহিদার ভিত্তিতে ঠিক হবে। একজন সেকুলার বক্তার ব্যক্তিগত বিমান থাকতে পারবে কিন্তু একজন ইসলামী বক্তার কেন নয় ?  

আজহারী বা আব্বাসীর বিভিন্ন ওয়াজের আয়োজকরা কত টাকা আয় করেন তা সাধারণের ধারণার বাইরে। হুজুরকে হেলিকপ্টারে করে আনলে ওয়াজে লোক বাড়ে, আয়োজকদের লাভের অঙ্কও বাড়ে| হুজুরের ওয়াজ আমরা ইউটিউবে দেখি তাতে লাভ ইউটিউবারদের (এক মিলিয়ন ভিউতে প্রায় এক হাজার ডলার) কিন্তু সিনেমার প্রযোজক আর ফুটবল ক্লাবের মালিকদের মত ওয়াজের আয়োজক, মসজিদ কমিটি, ইউটিউবারদের আমরা চিনি না। আমরা চিনি এই ১১৬ জনকে। 

আব্বাসী বা আজহারী প্রতি দশ হাজারে একজন। বাজারের সাধারণ সূত্র ও প্রতিযোগিতার নিয়মে এরা শীর্ষে পৌঁছেছে| লাখ টাকায়ও তাদের শিডিউল পাওয়া যায় না। বাজার তাদের মূল্য নির্ধারণ করেছে। টম ক্রুজ, ব্র্যাড পিটকে যেমন মহাতারকা বানিয়েছে বাজার। তাহেরী, অলিপুরীকেও তারকা বানিয়েছে বাজার। বাজারকে নিয়ন্ত্রন করার দুঃস্বপ্ন যারা দেখেন তারা বাজারের সংজ্ঞা জানেন না। বাজার সর্বেসর্বা| এক আব্বাসীকে জোর করে সরিয়ে দিলে সে জায়গা আরেক আব্বাসীই এসেই পূরণ করবে। 

২  

এই ১১৬ জন ধর্মীয় আলোচকের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ করেছে গণকমিশন। কিন্তু অভিযুক্তদের যে তালিকা তারা তৈরী করেছে তাতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ স্পষ্ট। বিভিন্ন সামাজিক, মানবিক উদ্দেশ্যে যেসব সেকুলার সংগঠন দেশ-বিদেশ থেকে ডোনেশান তোলেন তাদের বেলায়ও জঙ্গি অর্থায়ন এবং মানি লন্ডারিং আইন প্রযোজ্য কিন্তু গণকমিশন অমুসলিম এবং সেকুলার কোন ব্যক্তি বা সংগঠনকে তাদের বিবেচনায় আনেনি। ধর্মীয়-অধর্মীয় কোন বক্তা সুনির্দিষ্ট অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু গণহারে ইসলামী বক্তাদের তালিকা তৈরীর মানে কি ?    

বিচার প্রক্রিয়াকে যদি অনুরাগ বা বিরাগের বাইরে না রাখা যায় তবে তা বিচার নয়, প্রহসন। দেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি এই "গণকমিশন" সংশ্লিষ্টদের বিরাগ, বিরক্তি এবং বিদ্বেষ বেশ স্পষ্ট| তারা ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ এবং সঙ্গত কারণেই ধর্মপ্রচারকদের বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার নৈতিক অধিকার তাদের নাই। 
 
ইসলাম প্রচারের ভাষা কি হবে তা ঠিক করার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররমের মত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ আছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমদের সমন্বয়ে জনসাধারণের আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যারা ওয়ায়েজীনদের প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দিবেন, প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিবেন। কিন্তু এই কথিত গণকমিশন তো দূরের কথা চাটুকার দলীয় আলেমদের কথায়ও কাজের কাজ কিছু হবে না। 

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের দায় কেবল ওয়াজিনদের উপর চাপলেই হবে না। সম্প্রদায়ের উপরও তার দায় বর্তায়। সম্প্রদায়ের সিলেবাসে সম্প্রীতি না থাকলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওয়াজে লোকসমাগম হবে না, ভিউ বাড়বে না। জ্বালাও-পোড়াও মার্কা ওয়াজ ফেসবুক ফিডে পপকর্নের মত ফুটতে থাকে কারণ সম্প্রদায়ের তাওয়া গরম। 
 
এই ১১৬ জনও বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনেক ওয়াজ করেছে কিন্তু ফেসবুক-ইউটিবের সেসব ওয়াজে বেশ অনীহা। কারণ ফেসবুক-ইউটিউবও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; তারা প্রতিটা সম্প্রদায়কে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কন্টেন্ট পরিবেশন করে। আমরা কেমন নায়ক, গায়ক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, গণকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ধর্ম প্রচারক পাবো তা নির্ভর করে আমরা কেমন সম্প্রদায় তার উপর।  

লেখক : মার্কেটিং কনসালটেন্ট || ধর্ম বিশ্লেষক
ফেসবুক লিঙ্ক : Sajal Roshan

পাঠকের মন্তব্য