স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকাটাই স্বার্থকতা : নুসরাত জাহান ইলা

নুসরাত জাহান ইলা

নুসরাত জাহান ইলা

সাধারন মানুষের মধ্যে থেকেই অসাধারন মানুষের সৃষ্টি হয়। যদিও এই পথের বাঁকে বাঁকে রয়েছে অনেক ছোট ছোট গল্প। যে গল্প বিশ্বাসের, যে গল্প পরিশ্রমের, যে গল্প ধৈর্য্য ধারনের, যে গল্প সাহসীকতার। আর এ গল্পই হয়ে ওঠে একসময় সফলতার গল্প। সাফল্য তাদের কাছেই ধরা দেয় যারা সকল বাঁধা অতিক্রম করে থেমে গিয়েও পথের শেষ দেখতে স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যায়। তেমনিই একজন তরুণী নুসরাত জাহান ইলা। স্বামী, সন্তান ও সংসার সামাল দিয়ে বাবার স্বপ্নকে পুঁজি করে জীবন সঙ্গীর অনুপ্রেরণায় ঘুরে দাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। প্রতিবেশীদের কানাঘুষা দমাতে পারেনি অদম্য ইচ্ছাকে। সবকিছু পেছনে ফেলে ইলা আজ স্বাবলম্বী নারী উদ্যোক্তা। প্রতিদিন দেখেন সফলতার নতুন স্বপ্ন। 

অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে ইলা,পটুয়াখালীর গলাচিপায় জন্ম নিয়ে ছোট থেকে বেড়ে ওঠেন। উচ্চমাধ্যমিকে পড়া কালীন ২০১২ সালে তার বিয়ে হয়। স্বামী মাজহারুল ইসলাম শিপন, পেশায় একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরীজীবি। শিপন-ইলা দম্পতির এক মাত্র ছেলে ইনাম পড়ছে নার্সারিতে। এদিকে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় ইলা ছিলেন আদুরে। বাবা মরহুম গিয়াস উদ্দিন এলাহি ছিলেন রাজনীতিবিদ ও গলাচিপা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আর মা আজিমুন নেছা ডলি একজন গৃহিণী। গলাচিপা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও গলাচিপা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। 

২০১৮ সালে পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক শেষ করেন এরপরে স্নাতকোত্তর। একসময় বাবার স্বপ্ন ছিলো মেয়ে উকিল হবে। কিন্তু স্বপ্নচারিনী মেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেছেন অনলাইন ব্যবসায়। তাই মেয়ের সাথে বাবারও স্বপ্ন এক হয়ে গেলো। বাবা চান মেয়ে সফল উদ্যোক্তা হয়ে নাম করবে। এরপরেই ইলা গড়ে তুলেছেন "স্টাইল ক্রিয়েশন" নামে একটি ফেইসবুক পেজ। ক্রেতাদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী তার কাছে রয়েছে নানা রঙের আর ডিজাইনের থ্রিপিস,শাড়ি, বেড সিট। এখন মাসে আয় করছেন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। 

আজ শুনাবো তার সাফল্যের গল্প— 

আমাদের দেশের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষে চাকরি খুঁজতে ব্যস্ত থাকে সেক্ষেত্রে আপনি উদ্যোক্তা হলেন কেন ?— এমন প্রশ্নে ইলা বলেন, স্বাধীনভাবে কাজ করে মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোর চিন্তা থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা। বর্তমানে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই। নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত নিজে স্বাবলম্বিতা অর্জন করছে। ঘরে বাইরে সব পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। অনলাইন ব্যবসায়ের প্রবর্তনের ফলে নারীরা আরও বেশি পরিমাণে উদ্যোক্তায় পরিণত হচ্ছে। যা কারো অধীনে চাকুরী করে সম্ভব না। আর নারী হিসেবে চাকুরীতে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। এসব চিন্তা ভাবনা আর নিজের একটি পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতেই উদ্যোক্তা হওয়া।

উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ কিভাবে তৈরি হলো আর কাজের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল ? তিনি জানান, নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ থেকেই। দু'বছর আগে ২০১৯ এর মার্চের এক দুপুরে মোবাইল হাতে ফেইসবুকে স্ক্রল করছিলাম। হটাৎ চোখ আটকে যায় একটা পেজের লাইভে পন্য প্রদর্শনীতে। মনের আগ্রহ নিয়ে দেখি সেই লাইভটি। তখনই জানালাম অনলাইনে আয় করা যায়, ব্যবসা করা যায়। এরপরে ইচ্ছে জাগে অনলাইনে পণ্য নিয়ে কাজ করার। আমার স্বামীকে বললে তিনি খুব উৎসাহ দিলেন। আর বাবা ছিলেন অনেক স্বপ্নবাজ একজন মানুষ তাই তার কাছে যখন বললাম ব্যবসার কথা তিনিও রাজি হয়ে গেলেন। বাবা চাইতেন মেয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক ভালো কিছু করুক। তিনি সবসময় আমাকে স্বপ্ন দেখতে শেখাতেন, বলতেন "তুমি পারবে মা, এগিয়ে যাও, এটা ভালো কাজ, নিজ স্বপ্ন পূরণ করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করো"। আজ বাবা নেই, ২০১৯ সালের ২২ মে তিনি আমাদের ছেড়ে পরোলোক গমন করেছেন কিন্তু তার স্বপ্ন আজও জীবিত আছে। শূন্যতা একটাই আমার সাফাল্য টা আমার বাবা দেখে যেতে পারলও না।

তিনি আরোও বলেন, আমার স্বামী সবসময় আমার পাশে থেকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। পেজ খোলা থেকে শুরু করে পণ্য ডেলিভারি সর্বক্ষেত্রে তিনি আমাকে সহয়তা করেন। তার সহোযোগিতা ছাড়া এতদূর আশা সম্ভব হতো না। প্রথমে ৫,০০০ টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে পণ্য এনে "স্টাইল ক্রিয়েশন" নামে পেজ খুলি। পেজে নারীদের বিভিন্ন পোশাকের ছবি আপলোড করার পরে আর থেমে থাকতে হয়নি। এখন প্রতিদিন নিত্যনতুন পণ্যের সাথে অর্ডারের চাহিদা ও ক্রেতা সংখ্যা বাড়ছে। সল্প মূলধন নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে ব্যবসায়ের মূলধন বহুগুণে বেড়েছে। নিজস্ব পরিমণ্ডলে এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। 

অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে কোন প্রতিবন্ধকতা এসেছে কিনা ?  জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবেশীরা কানাঘুষা করতো। মেয়ে হয়ে অনলাইনে ব্যবসা এটা ঠিক না। পণ্যের দাম বেশি, ভালো পণ্য না। এধরণের নানা কটুবাক্য শুনতে হয়েছে। তবে কোন কথা আমার লক্ষ্য থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। তবে মাঝপথে একটা ধাক্কা খেয়েছি আমার পেজটি হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। খুব ভেঙে পড়ি তখন, ভাবতাম স্বপ্নটা ভেঙে গেলো। কিন্তু তারপরও ধৈর্য্য হারা হই নাই, আবার নতুন করে শুরু করলাম। নতুন পেজ খুলে ক্রেতা আকর্ষণ করতে আগের তুলনায় বেশি সময় দিয়ে পরিশ্রম করা শুরু করলাম। ফলে আবার আমার ব্যবসাটি চালু করতে পেরেছি।

উদ্যোক্তা হিসেবে কি সফল হয়েছেন, ভবিষ্যতে কি স্বপ্ন বা পরিকল্পনা আছে ?— তিনি বলেন, একজন উদ্যোক্তার প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো স্বপ্ন দেখা। একজন ব্যবসায়ী ও একজন উদ্যোক্তার মধ্যে এটাই পার্থক্য। আমার মরহুম বাবার স্বপ্ন ছিল একজন উদ্যোক্তা হব। সেই লক্ষ্যে আমার হাজবেন্ডের অনুপ্রেরনায় এগিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে পরিশ্রম করে যাচ্ছি। শুরুটা অনেক সহজ না হলেও পরিবার এবং আমার হাজবেন্ডের সহযোগিতায় আমি এগিয়ে চলতে সাহস পেয়েছি। পড়াশুনার পাশাপাশি নিজে কিছু একটা করার দৃঢ় ইচ্ছে থেকেই মাথায় আসে অনলাইন ব্যবসার পরিকল্পনা। তবে এ কাজে সব সময় আমার মা-বাবা ও আমার হাজবেন্ড পাশে থেকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সেই সঙ্গে শশুর বাড়ির লোকজন, আমার বন্ধু মহল ও Galachipa E-commerce & Entrepreneurs (GEE) অনলাইন গ্রুপ বিশেষ সহোযোগিতা করেছে। ভবিষ্যতে বড়ও বুটিক শপ দেয়ার ইচ্ছে আছে, সেখানে পিছিয়ে পড়া নারীদের কাজ করার সুযোগ দিবো। 

বর্তমান ব্যবসার অবস্থা সম্পর্কে ও নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য— এ উদ্যোক্তা জানান, ভালোই বিক্রি হচ্ছে প্রতিদিন। তবে অন্যান্য এলাকা থেকেও নিজ এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তার অনলাইন পেজ "স্টাইল ক্রিয়েশন" ভবিষ্যতে তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান। আর তার মতো যারা নারী উদ্যোক্তা হতে চান তাদের উদ্দেশ্য বলেন, আমার পরামর্শ থাকবে- স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার স্বার্থকতাটাই আলাদা। তাই বলবো, একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হলে আপনাকে অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমে পড়তে হবে। প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, তবে ইচ্ছা থাকলে তা ওভারকাম করা সম্ভব। স্বপ্ন, সামান্য পুঁজি আর পরিশ্রম থাকলেই অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যায়।

পাঠকের মন্তব্য