বাসা ভাড়া আবার বাড়লে গ্রামে ফিরবে রঙ্গলাল !

মিয়া মনসফ

মিয়া মনসফ

মিয়া মনসফ : আজ খুব সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গে রঙ্গলালের। ঘুম থেকে উঠে পায়চারি করছে ঘরের বারান্দায়।হাটতে হাটতে মাথা চুলকায় আর বিড়বিড় করে কি জানি বলতে থাকে- উহ! এত্তো টেনশন ভাল্লাগেনা! রঙ্গলালের কেন যে এতো টেনশন বোঝাই যায়না।

ফতুয়া গায়ে পরে রঙ্গলাল বের হয় বাসা থেকে। উদ্দেশ্য কোথাও যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে মন স্থির করতে পারেনি। তবুও সে বের হলো বাসা থেকে। বাসার ছোট গলি পেরিয়ে বড় রাস্তার ফুটপাত ধরে হাটছে রঙ্গলাল। উদ্দেশ্যবিহীন এই হাটা। গন্তব্য নেই। তবে তার মনের মধ্যে কিসের যেন একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

খিদে পায় রঙ্গলালের। হাটতে হাটতে রেস্টুরেন্ট খোঁজে। মালিবাগ পেরিয়ে আসতেই একটি হোটেলে ঢুকে রঙ্গলাল। হোটেলে এই সাত সকালে কাস্টমারে ভর্তি। এক কোণায় একটি খালি চেয়ার পেয়ে বসে যায় সেখানে। ক্যাশ কাউন্টারের পাশেই।

এক কাস্টমার খাবার শেষে বিল পরিশোধ করছে তখন। বেয়ারা ডাক দিয়ে জানায় সামনে এক শত ষাট টাকা। রঙ্গলালের কানে বাজে বেয়ারার ডাক। সকালের নাস্তার একজনের এতো টাকা বিল শুনে চক্ষু চড়কগাছ রঙ্গলালের! চেয়ার থেকে উঠে পড়ে সে। রঙ্গলালের পকেটে মাত্র পঞ্চাশ টাকা আছে।নাস্তা করে যদি পঞ্চাশ টাকার উপরে বিল হয় তখন কি করবে রঙ্গলাল! এই ভেবে অন্যত্র নাস্তা করার পরিকল্পনায় হোটেল থেকে বেরিয়ে যায়। এবারও বিড়বিড় করে বলতে থাকে।সকালের নাস্তায় এতো টাকা! 

একটু নিম্নমানের হোটেল খোঁজে রঙ্গলাল। হাটতে থাকে মতিঝিলের দিকে। একবার মতিঝিলের ফুটপাতে নাস্তা করেছে সে। কম দামে খুব মজাদার খাবার।গরম পরটার সাথে ডালভাজি।সেখানেই আজ নাস্তা করবে। হাটতে হাটতে চলে আসে মতিঝিল। ফুটপাতের পাশে পরটা বানাচ্ছে রহিম মিয়া।রহিম মিয়ার ছেলে পরটা ভাজছে। লোকের প্রচন্ড ভিড়।সবাই মতিঝিলের বিভিন্ন অফিসে চাকুরী করে। কে আগে নেবে কে পরে যেন প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। নাস্তা করে সবাই দ্রুত অফিসে যেতে চায়। 

রঙ্গলালও নাস্তার অর্ডার দিলো। পাশের দু’জন নাস্তা করতে করতে একজন আরেকজনকে বলছে-
আইজ যে দামে নাস্তা খাইতাছি, কাইল কিন্তু এইদামে খাওন যাইব না!
অন্যজন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জানতে চাইল, ক্যান?
ক্যান জানেন না! কাইলতো বাজেট পেশ অইব জাতীয় সংসদে।
অন্যজন মাথা নেড়ে সায় দিল। 

বাজেট পেশের পর কি হয় তারা জানে।এই পরটা একসময় এক টাকা দামে  খেয়েছে। এখন দশটাকা। বছর বছর চাহিদার সাথে সাথে দাম বেড়ে বেড়ে আজকের অবস্থায় এসেছে।দেশে বাজেট পেশের পর কিছু কিছু জিনিষের দাম বাড়ে।কেন দাম বাড়ে আলাপরত দু’জনের জানা থাকলেও রঙ্গলাল এ বিষয়ে খুব একটা জানেনা।  

এবার রঙ্গলাল ওদের কথায় কান পাতে। নাস্তা করতে করতে ওদের কথা শুনছে।
রঙ্গলাল আগ বাড়িয়ে ওদের সাথে কথায় যোগ দিল এবং জানতে চাইল- ভাই, একটু বুঝিয়ে কইবেন, এই দাম কাইল ঠিক থাকবো না ক্যান!

আরে ভাই সবকি খুইল্যা কওন লাগে! বাজেট পেশ অইবার পর অনেক জিনিষের দাম বাড়ে এই সোজা কথাটি কি জানেন না! রঙ্গলাল জানতে চায়, ভাই একটু কঅন না দেহি কি কি জিনিষের দাম বাড়বো ?

একজন রাগত স্বরে বলে উঠে, কি মুশকিল ক্যামনে কমু ভাই কোন্ জিনিষের দাম বাড়বো আর কমবো। অহনো বাজেট পেশ অয় নাই। কাইলই জানবার পারুম।আপনেও কাইল জানবার পারবেন! 

রঙ্গলাল তাদের কথায় চুপ মেরে যায়। নাস্তা দ্রুত মুখে পুরতে থাকে। নাস্তা শেষে পকেট থেকে পঁচিশ টাকা নাস্তার বিল দিয়ে রঙ্গলাল হাটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে। সকাল থেকে যে অস্থির সময় পাশ করছে রঙ্গলাল তা হচ্ছে কাল বাজেট পেশের পর কোন কিছুর দাম বাড়বে কিনা এই দুশ্চিন্তা নিয়ে! 

প্রতিবার বাজেটে কোন পণ্যের উপর শুল্ক বাড়ানো হলেই ঐ পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সেই পণ্যের দাম বেড়ে যাবার ফলে অন্যান্য জিনিষের দাম ও বাড়ে। দাম বাড়ে সব জিনিষের। বাসের ভাড়া বাড়ে। ঔষধের দাম বাড়ে। আর এই সুযোগে বাড়ীওয়ালা বাসা ভাড়ার দামও বাড়িয়ে দেয়। 

রঙ্গলাল জিনিষের দাম বাড়ানো নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নয়। বাসা ভাড়া বৃদ্ধি নিয়েই যত দশ্চিন্তা তার। বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার ঢাকা ছেড়ে গ্রামমুখি হবার চেষ্টা চালিয়েছিল সে। কিন্তু সংসারের অন্যান্য খরচ কমিয়ে রঙ্গলাল ঢাকায় থেকেছে। আরেকটু কম ভাড়ায় বাসার জন্য ফি বছর বাসা ছেড়ে কম ভাড়ায় বাসা নিয়েছে। এবার যদি বাজেট পেশের পর বাসা ভাড়া বাড়ে, বাসা পরিবর্তন করেও লাভ হবেনা রঙ্গলালের। এইজন্য এবছরের বাজেটের কথা শুনেই রঙ্গলাল অস্থির সময় পার করছে। 

রঙ্গলাল যে বাসায় থাকে ঐ বাসার মালিক নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম বাড়ার অজুহাতে প্রতিবছর বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে একটুও কালক্ষেপন করেননা।
 
রঙ্গলাল এবার দ্রুত মতিঝিল ছেড়ে পশ্চিম দিকে হাটতে থাকে । যেখানে মানুষের একটু জটলা দেখতে পায় সেখানেই দাড়িয়ে কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করে। কেউ বাজেট নিয়ে কথা বলে কিনা সেদিকেই তার খেয়াল। রঙ্গলাল জানে বাজেট বক্তৃতার পর পর জিনিষের দাম বাড়লে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হয়। মিছিল করে দলীয় লোকজন। এই বাজেট মানিনা ! মানিনা! শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর করে তোলে রাজপথ। যারা বাজেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় তারা বিরোধী দলের সমর্থক! 

আবার বাজেট পেশের পর আনন্দ মিছিলও হয়।দাম বাড়লেও আনন্দ মিছিল করেছে সরকারী দল। এই নিয়ম ছোটকাল থেকে দেখে আসছে রঙ্গলাল। বাজেট প্রতিক্রিয়ার সংবাদ ফলাও করে প্রকাশ পায় ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়। 

বছরের নতুন বাজেট পেশের পর পক্ষ বিপক্ষের আনন্দ মিছিল বা প্রতিবাদ মিছিল যেটাই হোক না কেন রঙ্গলালের কোন মন্তব্য নেই। রঙ্গলাল শুধু জানতে চায় জিনিষপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে কিনা। যদি জিনিষপত্রের দাম না বাড়ে তাহলে বাড়ী ভাড়া নাও বাড়তে পারে। রঙ্গলালের তখন ঢাকা ছাড়ার প্রয়োজন হবেনা।
 
রঙ্গলাল হাটতে হাটতে পল্টন মোড়ে পৌঁছে। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হবার অপেক্ষায়। পাশে এক ভদ্রলোক ডিজিটাল ব্যানার হাতে নিয়ে রাস্তা পার হবার অপেক্ষায়।

রঙ্গলাল লোকটিকে জানতে চাইল, ভাইজান আপনের হাতে এইটা কিসের ব্যানার ?

লোকটি কোন উত্তর দিল না। আড় চোখে রঙ্গলালের দিকে তাকিয়ে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে গেলেন তিনি !
রঙ্গলালের বুঝতে বাকি নেই, নিশ্চয়ই আগামীকাল বাজেটের পর পক্ষে বা বিপক্ষে কোন কর্মসূচির ব্যানার হবে! রঙ্গলাল স্মীত হেসে রওনা হলো বাসার দিকে।
  
দুপুরের খাবার শেষে একটু বিশ্রাম নেয়। সন্ধ্যায় বের হয় আবার। হাটতে থাকে। হাটতে হাটতে প্রেসক্লাব এসে পৌঁছায়। রঙ্গলালের মতো আরো বেশ ক’জন দাড়িয়ে দাড়িয়ে গল্প করছে। আরেকটু দূরে তিন চারজন দাড়িয়ে গল্পে মগ্ন। তাদের আলোচনার বিষয় কাল এখানেই বাজেট বিরোধী প্রতিবাদ মিছিল হবে। এবার সাহস পেলোনা রঙ্গলাল। 
খুব ইচ্ছে করছে তাদের কাছে জানতে, জিনিষের দাম বাড়ার কোন খবর তারা পেয়েছে কিনা! তা নাহলে প্রতিবাদ মিছিল কেন! কিন্তু রঙ্গলালের সাহস করে জানতে কি আর চায়!

এবার সেখান থেকে হেটে গুলিস্তান পৌছাঁয় রঙ্গলাল। এখানেও বাজেটের পক্ষে আগামীকালের আনন্দ মিছিলের খবর জানতে পারলো। সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরেও রঙ্গলাল এবারের বাজেটে জিনিষপত্রের দাম বাড়বে বা কমবে কিনা তা কিন্তু জানতে পারেনি! 

ফেরেশান হয়ে বাসামুখি হলো রঙ্গলাল। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লানি ভর করেছে শরীরে। মহা দুশ্চিনায় নিমগ্ন। তাড়াতাড়ি রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কখন সকাল হবে সেই অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। আগামীকাল বাজেট পেশ হবে একাদশ জাতীয় সংসদে। কাল সারাক্ষণ টিভির সামনে কাটাবে রঙ্গলাল। কালই জানা যাবে এবার বাজেটের পর জিনিষপত্রের দাম বাড়বে কিনা! যদি দাম না বাড়ে বাড়ী ভাড়া হয়তো বাড়িওয়ালা বাড়াবেননা। আর যদি জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যায় লাগামহীনভাবে, তাহলে নিশ্চিত বাড়ী ভাড়া বৃদ্ধির খড়গ মাথার উপর এসে পড়বে। তখন রঙ্গলাল পরিবার নিয়ে গ্রামে ফেরার প্রস্তুতি নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা!

লেখকঃ যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী(এমএনএ) 

পাঠকের মন্তব্য