বন্যা দুর্গতদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছে রঙ্গলাল

বন্যা দুর্গতদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছে রঙ্গলাল

বন্যা দুর্গতদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছে রঙ্গলাল

মিয়া মনসফ : গতপরশু ছিল ছুটির দিন। রঙ্গলাল সারাক্ষণ অলস সময় কাটিয়েছে বাসায়। তবে এই সুযোগে দিন দুনিয়ার খবর রাখে রঙ্গলাল। টিভির সামনেই কাটায় সারাক্ষণ। এ নিয়ে গিন্নি ও সন্তানের সাথে ঝগড়াঝাটিও হয় মাঝে মাঝে। টিভির সামনে বসলেই রঙ্গলাল রিমোটটি নিজের কব্জায় নিয়ে টিভির পর্দায় চোখ রাখে। শুধু খবর আর খবর। এই এক নেশা রঙ্গলালের। লোকাল থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সবই তার শুনতে হবে।  

রান্নাঘর থেকে গিন্নি ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকে রঙ্গলালের উদ্দেশ্যে। কি যে পাইছে খবরে ! শুক্রবারে কাউকে টিভিতে অনুষ্ঠান দেখারও সুযোগ দেয়না ! 

রঙ্গলাল গিন্নির ঘ্যানর ঘ্যানর কথা শুনেও চুপ করে থাকে। এ চ্যানেল থেকে ও চ্যানেলে রিমোট কন্ট্রোলের বটম টিপে টিপে খবর দেখছে। এক উদ্বেগ উৎকন্ঠায় সময় পার করছে রঙ্গলাল। 

হঠাৎ নিজের শয়ন কক্ষ থেকে সন্ধ্যার আবহ অনুভব করে। বাইরের জানালা দিয়ে দেখতে পায়  আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। নেমে আসছে নিকষ কালো অন্ধকার। মৃষলধারের বৃষ্টি নামলো এবার। এক অজানা শংকায় রঙ্গলালের উপর দুশ্চিন্তা ভর করে। 

গতরাত থেকে সিলেট সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির খবর জেনেছে। বৃষ্টির পানিতে চট্টগ্রামে হাটু পানিতে ডুবে আছে শহরের বিভিন্ন জায়গা। আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলা তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যেতে নির্দেশনা দিয়েছেন। অতি বৃষ্টির কারণে প্রায় পাহাড় ধসে মানুষ মরে চট্টগ্রামে। এবার আগেভাগেই প্রশাসন সতর্ক নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রশাসনের কথায় মানুষ আমলে নেবে তো! যদি না নেয়, পাহাড় ধসের যদি মানুষ মারা যায় তখন এ দায় কার! এসব নিয়ে রঙ্গলালের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

রঙ্গলাল আজ ঘুমায়নি। সারারাত বসে আছে টিভির সামনে। সিলেট সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির উপর তীক্ষ্ন নজর তার। সিলেট শহরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। এক লোকালয় থেকে আরেক লোকালায় পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে। অনেক উচুঁ এলাকায়ও পানি ঢুকে পড়েছে। রঙ্গলালের অনেক পরিচিতজন থাকে সিলেটে। অনেক এলাকা রঙ্গলালের চেনা। সেসব জায়গায় বন্যার পানি উঠেছে কিনা তারও খবর রাখছে। অনেকের খবরাখবর নিতে ইচ্ছা করছে রঙ্গলালের, কিন্ত খবর নিয়ে লাভ কি হবে! সে কি সাহায্য করতে পারবে! কী বা করার আছে রঙ্গলালের। কিন্তু তার প্রিয় মানুষগুলো ভালো থাকুক। বন্যামুক্ত থাকুক! এটাই কামনা রঙ্গলালের।  

এরই মধ্যে আজ সকালে ডুবে গেছে শহরের উচুঁ এলাকা জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, মীরাবাজার,বাগবাড়ি, বারুতখানা ও জল্লারপাড়সহ প্রায় ২৫টি নতুন এলাকা সম্পূর্ণভাবে ডুবে গেছে বন্যার পানিতে। ইতিমধ্যে শহরের প্রায় এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কোথাও হাটু পানি, আবার কোথাও কোমর পানিতে ডুবে আছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকেছে। মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। তবে একটু প্রশান্তির খবর হচ্ছে, ইতিমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। চলছে ত্রাণ বিতরণ। সরকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ত্রাণ কার্য্ক্রম অব্যাহত রেখেছে। নেমেছে সেনাবাহিনী। 

ইতিমধ্যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আছে। আরো বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি যদি হয় বন্যার আরো অবনতি হবে। আজ ওসমানি মেডিকেলে পানি ঢুকেছে।হাসপাতাল প্রাঙ্গন থেকে ওয়ার্ডে পানি ঢোকার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটার ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বিদ্যুৎ বন্ধের কারণে সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জে ব্যাংকের কার্য্ক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সিলেটেও যেকোন মুহুর্তে বন্ধ হতে পারে  ব্যাংকের কার্য্ক্রম। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে অন্যত্র।  

কেন এতো বন্যা হচ্ছে! শুধু আমাদের দেশে নয়, আমাদের প্রতিবেশী দেশ সীমান্ত লাগোয়া আসামেও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উজানের পানি সুনামগঞ্জ ও সিলেটসহ আমাদের দেশের বিভিন্ন নদনদী দিয়ে আমাদের দেশে এসব পানি ঢুকে বন্যা সৃষ্টি করে। 

সিলেট সুনামগঞ্জের এবারের বন্যা ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যাকে ও ছাড়িয়ে গেছে। বন্যার পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে সিলেটে দু’বার বন্যা হয়ে গেলো। এ বছর এই বন্যার কারণ হলো মেঘালয়ে অত্যধিক বৃষ্টি। এবছর মেঘালয়ের বৃষ্টি ৬০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

প্রকৃতির এই তেজোদীপ্ত রূপের কারণ জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব তো আছেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি হতে পারে।  প্রাকৃতিক দুর্যোগের উপর আমাদের কারো কোন হাত নেই। এজন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি দরকার সর্বাগ্রে। 

চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মারা গেছে ৪ জন। তম্মধ্যে দুই শিশু অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে। মারা গেছে তাদের মা ও খালা। বাবা ও তাদের বড় ভাই অনত্র থাকার কারণে তারা বেঁচে গেছে। পাহাড় যখন ধসে পড়ে তানহা ও তিন্নি মায়ের বুকেই ছিল। রাখে আল্লাহ মারে কে! এই দুর্ঘটনায় তাদের মা ও খালা মারা গেলেও শিশু দুটি অক্ষত ছিল। 

আরো পাহাড় ধসের আশংকা থেকে প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অর্থাৎ বন্যার আরো অবনতি হবার আশংকা রয়েছে। ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জের পার্শবর্তী জেলা নেত্রকোনায় ও বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। যমুনার পানিও বাড়ছে। রঙ্গলাল আরেক দুশ্চিন্তায় নিমগ্ন। ঢাকার দিকে বন্যার পানি ধেয়ে আসবেনা তো!

দেশের বন্যার এই মারাত্মক অবস্থার কথা জেনে দু’দিন ধরে দুশ্চিন্তায় ভুগছে। আজ একটিবারের জন্যও বাসার বাইরে যায়নি। সারাক্ষণ টেলিভিশনের সামনে বন্যাক্রান্ত সিলেট সুনামগঞ্জ জেলার দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের অবস্থার খবর নিয়েছে। রঙ্গলালের প্রত্যাশা ৮৮,৯৮ এর মতো মানুষ এগিয়ে আসবে বন্যার্থদের সহযোগিতায়। মানবতা কখনো চুপ করে থাকেনা । থাকতে পারেনা। মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের বিপদ আপদে মানুষই এগিয়ে আসে। 

এদেশের মানুষ পরের কষ্টে ব্যথিত হয়। মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাগবে সাহায্যের হাত বাড়ায়। নিশ্চয় সিলেট ও সুনামগঞ্জবাসীদের জন্য মহাদুর্যোগ। এ দুর্যোগে সবাই এগিয়ে আসবে মানবতার সেবকরা। পানিবন্দি মানুষের এ মহাবিপদ কেটে যাবে একদিন। আকাশে প্রত্যাশার আলো ছড়িয়ে পড়বে। সেই প্রত্যাশায় বানভাসী মানুষের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছে গণমানুষের এক দুরন্ত প্রতীক ‘রঙ্গলাল’।

পাঠকের মন্তব্য