হিপ্ হিপ্ হুর্ রে, ঈদে বাড়ি যাইরে ! রঙ্গলালের মন ফুর্ ফুর রে !

মিয়া মনসফ

মিয়া মনসফ

মিয়া মনসফ : ঈদ করতে বাড়ি যাইত্যাছি ! রেলে চইড়া ! আহ্ কি শান্তি ! কি আনন্দ ! হিপ্ হিপ্ হুর রে ! মন ফুর্ ফুর্ রে। ট্রেনের সিটে বসে জানলা দিয়ে মাথা বের্ করে, একহাতের ভি চিহ্ন দেখিয়ে উল্লাস করতে থাকে রঙ্গলাল। আজ অফিস শেষে বিকেলের ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছে পরিবার নিয়ে। দু’বছর ঈদে বাড়ি যেতে না পারার কষ্ট ভুলে গেছে। 

ঈদের ছুটিতে এবার বাড়ি যাবার ইচ্ছে পূরণ হলো রঙ্গলালের। ট্রেনের টিকেট নিতে মহা বিড়ম্বনায় পড়েছিল রঙ্গলাল। ধরে নিয়েছিল এবছরও আর বাড়ি যাওয়া হলোনা। শেষতক টিকেট পেয়েছে মহাযুদ্ধ করে। গত দু’বছর গ্রামের বাড়ি যায়নি করোনা মহামারীর কারণে। তাই এবার ঈদে বাড়ি যাবার আনন্দ একটু বেশিই বটে। তবে ট্রেনের টিকেট সংগ্রহ কত ঝক্কি ঝামেলা রঙ্গলালের ভালই অভিজ্ঞতা আছে।

১লা জুলাই থেকে ট্রেনে আগাম টিকেট দেয়া হবে রঙ্গলাল জানতো। তাই নিজেই লাইনে দাড়িয়ে টিকেট সংগ্রহ করবে রঙ্গলাল এমন সিদ্ধান্ত আগে থেকে নিয়ে রেখেছিল। ঈদ যাত্রার টিকেটের চাহিদা সম্পর্কে সে খুবই ভালো জানে। তাই ১লা জুলাই সকাল ৯টায় রঙ্গলাল কমলাপুর পৌঁছে যায় টিকেট সংগ্রহ করতে।

টিকেট কাউন্টারে পৌঁছার আগে রঙ্গলালের চোখে পড়ে ট্রেনের টিকেট কাউন্টারের সামনে প্রশস্থ জায়গায় বিশাল মানুষের সমাবেশ। এতো মানুষ কেনো বুঝে উঠতে পারছেনা। হয়তো কোন মিটিং হবে ! এখানে মাঝে মাঝে শ্রমিকদের সমাবেশ হয়। রঙ্গলাল এমন কোন সমাবেশের কথাই ভাবছে।সামনে দাড়ানো একভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেও কোন সদোত্তর পায়নি। প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে সবাই। একটু ভিড় ঠেলে রঙ্গলাল সামনে  যাবার চেষ্টা করে। এবার বুঝতে পারে এতো জনসভা বা কোন মিটিং না। ঈদের আগাম টিকেট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন জনসভায় রূপান্তরিত হয়েছে। টিকেট কাউন্টারের সামনে লাইনের পর লাইন। দীর্ঘ লম্বা লাইন। আঁকাবাঁকা লতার মতো পেঁচাতে পেঁচাতে লাইন আর লাইন নাই। 

রীতিমত হট্টগোল চেচামেচি চলছে টিকেট নিয়ে। সন্ধ্যা শেষে জানানো হলো আজকের মতো টিকেট বিক্রি শেষ। রঙ্গলালসহ হাজার হাজার মানুষ কাঙ্খিত টিকেট পেলোনা। তখনো হাজারো মানুষ কাউন্টারের সামনে। কী আর করা ! 

টিকেট না পাওয়া মানুষগুলো ক্ষোভে দুঃখে নানান কথা শেয়ার করছে পরস্পরে। কেউ বলছে আমি সেই ভোর ৪টায় এসেও টিকেট পেলামনা। আরেকজন বলছে আরে ভাই আপনি তো ভোরে এসে টিকেট না পেয়ে আপসোস করছেন, আমি যে গতকাল সন্ধ্যার পর এখানে এসে লাইন ধরেও টিকেট পেলামনা! অনেকে তারও আগে এসে লাইনে দাড়িয়েছিল। 

রঙ্গলাল টিকেট কিনতে আজ সকালে এসে লাইনে দাড়িয়েছে।গতকাল রাতে এসেও অনেকে টিকেট পায়নি সেতো পাবার কথা নয় ! এই ভেবে রঙ্গলাল সবার কথা শুনে প্রবোধ নেয়।সবার মতো সেও মন খারাপ করে বাসায় ফিরলো।
আজ ছিল ট্রেনের আগাম টিকেট সংগ্রহের প্রথম দিন। 

দ্বিতীয় দিনের টিকেটের প্রত্যাশায় রঙ্গলাল বাসায় ফিরে ভাবতে থাকে। টিকেট না পেলে বাড়ি যাবে কিভাবে! দু’বছর বাড়ি যায়নি। এবছর ঈদে বাড়ি যাবার সংকল্প করেছে। রাতের খাবার খেয়ে আবার ভোঁ দৌড় কমলাপুর স্টেশনের দিকে।  আগামীকালের টিকেট নিতে ইতিমধ্যে কয়েক শ’ নারী পুরুষ লাইনে দাড়িয়েছে। রঙ্গলাল টিকেটের জন্য আগতদের পেছনে দাড়ালো। হাতে একটি ছোট ফোল্ডিং চেয়ার, টিফিন বক্সে রাত কাটানোর প্রয়োজনীয় খাবার ও পানির বোতল।  সবাই লাইন ধরে আছে।ফ্লোডিং চেয়ারটি সেট করে রঙ্গলাল চুপচাপ বসে আছে। আর একটি দৈনিক পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতে থাকে। 

অন্যরাও গল্পগুজবে মগ্ন।নানান রকম আলোচনায় রাত পার করার চেষ্টা সবার। আলোচনার মধ্যে টিকেট নিয়ে আলোচনার বিষয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে।

তরুনদের মধ্যরাতের এই ব্যতিক্রমী আলোচনায় রঙ্গলালও যোগ না দিয়ে পারে !

আলোচনার ফাঁকে রঙ্গলাল জানতে চায়, আচ্ছা ভাইয়েরা, আপনেরা কি জানবার পারছেন কত্তো টিকেট ছাড়বো ! অন্যরা রঙ্গলালের কথায় হা হা করে হেসে উঠে ! রঙ্গলাল একটু বিরক্ত হয়ে আবার জিগায়। ভাই হাসছেন ক্যান ?
একজন রঙ্গলালকে বুঝাইলেন, আরে ভাই ট্রেনের যে ক’টা সিট আছে ততটাই টিকেট ছাড়বো। কমও ছাড়বোনা, বেশিও ছাড়বোনা।

আইচ্ছা ! তয় আমরা সবাই পামু তো !

আপনে কি পাগল অইছেন! সবাই টিকেট পাইবার কথা ভাবেন ! বাড়ি যাইবার যার ভাইগ্যে আছে সে-ই টিকেট পাইব !
রঙ্গলাল বুঝতে পারছে টিকেটের চেয়ে টিকেটপ্রত্যাশীর মানুষ বেশি! এতো মানুষ কষ্ট করে রাত জেগে যদি টিকেট না পায় এর চেয়ে কষ্ট আর হয়না।

এবার রঙ্গলাল সবার সামনে একটা বয়ান দেবার চেষ্টা করে। এই বয়ান রেল কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে একটি দাবী। ফোল্ডিং চেয়ারের উপর দাড়িয়ে সবাইকে আহবান জানায় রঙ্গলাল-

ভাইসব, আমি একটা কথা কইবার চাই, সবাই দয়া করে শোনেন- রেল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী করতাছি আমাদের সবার পক্ষ থেইক্যা- আগামী বছর ঈদ যাত্রার টিকেট আমগো সবাইরে দিতে অইব! সবাইকে টিকেট দিবার না পারলে, যাগো দিবেন তাদেরকে লটারীর মাইধ্যমে নাম নির্ধারণ কইরতে অইব ! তহন লটারীতে টিকেট না পাইলেও মন খারাপ অইবনা।
ভাই আপনেরা আমার পস্তাবে রাজী আছইন !

রঙ্গলালের এই প্রস্তাবের প্রতি রাতে আসা হাজার খানেক টিকেট প্রত্যাশী হাত তুলে সমর্থন জানালেন। টিকেট প্রত্যাশীদের একজন কিভাবে লটারী অইব তাও বিস্তৃত করলেন। অনলাইনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রেশন করে সেখান থেকে লটারীর মাধ্যমে টিকেটপ্রাপ্তদের নাম চুড়ান্ত করার দাবী জানিয়েছে রঙ্গলালসহ এবছর ঈদের ট্রেনের টিকেটপ্রত্যাশীরা।  

রাত যখন ১টা তখন নারী পুরুষ মিলিয়ে প্রায় হাজারেরও বেশি টিকেট প্রত্যাশী মানুষ কমলপুর টিকেট কাউন্টারের সামনে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালে টিকেট সংগ্রহ করার প্রত্যাশায়। এমন আশাই সবার। রাত বাড়ে। কমলাপুরের টিকেট কাউন্টারের সামনে টিকেটপ্রত্যাশীদের সারিও বাড়তে থাকে সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে।

রঙ্গলাল পত্রিকা পড়তে পড়তে চিন্তায় মগ্ন। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখে ঘুম নেমে আসে। পত্রিকাটি বিছিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ফ্লোরে। 

একসময় ভোর হয়। কমলাপুর স্টেশনে কোলাহল বাড়ে।টিকেট সংগ্রহকারীর সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে সকাল হতে না হতেই। ৮টায় টিকেট কাউন্টার খোলার সাথে সাথে সরব হয়ে উঠে লাইনে দাড়ানো টিকেট প্রত্যাশীরা।হুমড়ি খেয়ে পড়ে টিকেটের জন্য। সময়ের সাথে সাথে দিন শেষ হয়ে যায়। রঙ্গলাল আজো টিকেট নিতে পারলোনা।

তৃতীয় দিনের টিকেটের জন্য আবার রাতে এসে লাইনে দাড়ায় রঙ্গলাল। রাত শেষে সকাল হয়। আর রঙ্গলাল সিদ্ধান্ত নেয়, যদি টিকেট আজ না পায় বাড়ী যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করবে।

সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো।রঙ্গলাল প্রায় টিকেট কাউন্টারের সামনে এসে দাড়ালো। গতকালও প্রায় কাছে এসেই টিকেটের নাগাল পেলোনা। 

আজও কি তাই হবে ! বুক দুরু দুরু করছে রঙ্গলালের।সামনের টিকেট প্রত্যাশী ব্যক্তিটি টিকেট নিয়ে মহানন্দে কাউন্টার ছেড়ে দ্রুত চলে গেলো। রঙ্গলাল ৪টি শোভন টিকেটের জন্য টাকা এগিয়ে দেয় কাউন্টারে দায়িত্বরত ব্যক্তির দিকে। কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি গম্ভীরভাবে কম্পিউটারে দৃষ্টি ফেললো। সময় নিলো মিনিট খানেক। রঙ্গলালের চোখ মুখ লাল হয়ে আসে।শোন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। কপালে ভ্রু কুচকে কম্পিউটারের কী বোর্ডে কীতে চাপ দিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্টারের ভদ্রলোক। প্রিন্টারে টিকেট প্রিন্ট হচ্ছে ! স্পস্ট বুঝতে পারে রঙ্গলাল। দুশ্চিন্তার চেহারায় খুশির রেখা ফুটে ওটে রঙ্গলালের। মুহুর্তের মধ্যে চারটি টিকেটের প্রিন্ট করা টিকেট রঙ্গলালের হাতে তুলে দিতেই রঙ্গলাল টিকেট নিয়ে ভোঁ দৌড়। 
এক দৌড়ে রাস্তায় এসে বাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকে আর উচ্চস্বরে বলতে থাকে ‘হিপ্ হিপ্ হুর্ রে ! ঈদে বাড়ি যাইরে ! মন ফুর্ ফুর্ রে।

পাঠকের মন্তব্য