ভারতের ‘পুরুষ পেটানো’ নারী লাঠি বাহিনী নাম গুলাবি গ্যাং

ভারতের ‘পুরুষ পেটানো’ নারী লাঠি বাহিনী গুলাবি গ্যাং

ভারতের ‘পুরুষ পেটানো’ নারী লাঠি বাহিনী গুলাবি গ্যাং

২০০৬ সাল। ভারতের উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখণ্ডের ছোট্ট এক গ্রাম। সেদিন সকালে গ্রামবাসী চমকে উঠল অসহায় এক নারীর আর্তচিৎকারে। স্বামী তাকে বেদম পেটাচ্ছিল। মারের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। পিছু নিয়েছিল পাষণ্ড স্বামীও। সাহায্যের জন্য চিৎকার করে কাঁদছিল নারী। তবে এগিয়ে এলো না কেউ। এ যে নিত্যদিনের ঘটনা ! তবে সইতে পারলেন না একজন। 

লোকটাকে থামানোর চেষ্টা করলেন, 'কেন ওকে মারছ ? তোমার মতো সেও তো একজন মানুষ। না হয় কোনো দোষ করেছে, তাই বলে মানুষ এভাবে মানুষকে মারে ?' সঙ্গে সঙ্গে রেগে কাঁই হয়ে গেল লোকটা, 'আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে নাক গলানোর তুমি কে ?' পতিদেবতার রাগ গিয়ে পড়ল সেই মহিলার ওপর। পেটাল তাঁকেও। মার খেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সারা রাত বিমূঢ় কাটালেন। পরদিন সকালে গ্রামের আরো পাঁচজন নারীকে জড়ো করে মজবুত লাঠি নিয়ে ফিরে গেলেন সেই বাড়িতে। সবাই মিলে মারলেন লোকটাকে, যতক্ষণ না ব্যথায় নীল হয়ে করজোড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করল।

ঘটনাটি সারা গ্রামে রটে গেল। একজন-দুজন করে অনেক নারী এসে দেখা করলেন। সম্পত পাল দেবীর কাছে গিয়ে অভাব-অভিযোগ জানালেন। তাঁদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করতে অনুরোধ করলেন, পাশে থাকারও অঙ্গীকার করলেন। নারীদের একত্র করলেন তিনি, একটা দল গড়ে নাম দিলেন 'গুলাবি গ্যাং', যাঁদের চিনে নিতে হয় পরনের গোলাপি শাড়িতে, 'গোলাপি রঙের সঙ্গে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দলের সংস্রব নেই। '

 ঐ গ্রামে এবং আশপাশে যারা স্ত্রীদের মারধর করতো, নারীদের উত্যক্ত করতো, বলাৎকার করতো, তাদের বিরুদ্ধে বা এলাকার দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ঐ নারী সংগঠন। তাদের সদস্যরা রীতিমত লাঠি-সোটা নিয়ে মারপিট করতো।

বর্তমানে গুলাবি গ্যাং নামে ঐ সংগঠন দেশের বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে, যাদের সদস্যরা মূলত গৃহবধূ, পরনে থাকে গোলাপি রংয়ের শাড়ি, হাতে লাঠি। তাদের নিয়ে বলিউডে একটি চলচ্চিত্র পর্যন্ত তৈরি হয়েছে।

কিভাবে তার মাথায় একটি নারী গ্যাং গঠনের কথা মাথায় আসে ?

গুলাবি গ্যাং সগঠনের নেত্রী সাম্পাত দেবী জানান- আমি শুধু ভাবতাম কতদিন আর এভাবে সহ্য করবো। কোনো কারণ ছাড়াই মেয়েদের পেটানো হচ্ছে। কতদিন এমন ভয়ের মধ্যে আমরা বাঁচবো ?

তার জন্ম ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের প্রত্যন্ত বুন্দেলখান্ডে। এই অঞ্চলে সমাজে-সংসারে নারীর মর্যাদা খুবই নিচুতে। স্বামী বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার, মারধর নিত্যদিনের ঘটনা। সেইসাথে রয়েছে নারীদের উত্যক্ত আর ধর্ষণের জন্য তৎপর অপরাধী চক্র।

তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার ভেতর ন্যায়-অন্যায় বোধ টনটনে ছিল। "কিন্তু আপনি যখন ছোটো তখন লড়াই সম্ভব নয়। কিন্তু আমি জানতাম বড় হলে আমি নারীদের বিরুদ্ধে এই অনাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো।

মাত্র ১২ বছর বয়সে সাম্পাত দেবীকে স্কুল ছাড়িয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু লেখাপড়া শেখার স্পৃহা তার যায়নি। গ্রামের ছেলেদের কাছ থেকে সে পড়াশোনা শিখতো। তারপর ১৬ বয়সে সে প্রথম অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলো।

সাম্পাত দেবী বলেন, আমি জানতাম জোটবদ্ধ হলে আমরা অনেক শক্তিধর। তখন বাইরের কারো কোনো সাহায্য লাগবে না। যখন একজন নারী একা কিছু করতে পারবেনা, হাজার নারী তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে।

গান গেয়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজেই গান বাধতের সাম্পাত। গানের ভাষা ছিল এরকম- অনেকদিন হয়ে গেছে। ভারতের নারীরা তোমরা এখন জাগো, উঠে দাঁড়াও। আমরা ঘরে কখনই শান্তিতে থাকতে পারিনি। সুতরাং একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াও।

তার জন্ম ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের প্রত্যন্ত বুন্দেলখান্ডে। এই অঞ্চলে সমাজে-সংসারে নারীর মর্যাদা খুবই নিচুতে। স্বামী বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার, মারধর নিত্যদিনের ঘটনা। সেইসাথে রয়েছে নারীদের উত্যক্ত আর ধর্ষণের জন্য তৎপর অপরাধী চক্র।

তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার ভেতর ন্যায়-অন্যায় বোধ টনটনে ছিল। কিন্তু আপনি যখন ছোটো তখন লড়াই সম্ভব নয়। কিন্তু আমি জানতাম বড় হলে আমি নারীদের বিরুদ্ধে এই অনাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো।

মাত্র ১২ বছর বয়সে সাম্পাত দেবীকে স্কুল ছাড়িয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু লেখাপড়া শেখার স্পৃহা তার যায়নি। গ্রামের ছেলেদের কাছ থেকে সে পড়াশোনা শিখতো। তারপর ১৬ বয়সে সে প্রথম অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলো।

সাম্পাত পাল দেবী বলেন, আমি জানতাম জোটবদ্ধ হলে আমরা অনেক শক্তিধর। তখন বাইরের কারো কোনো সাহায্য লাগবে না। যখন একজন নারী একা কিছু করতে পারবেনা, হাজার নারী তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে।

গান গেয়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজেই গান বাধতের সাম্পাত পাল দেবী। গানের ভাষা ছিল এরকম- অনেকদিন হয়ে গেছে। ভারতের নারীরা তোমরা এখন জাগো, উঠে দাঁড়াও। আমরা ঘরে কখনই শান্তিতে থাকতে পারিনি। সুতরাং একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াও।

কিভাবে তাদের নাম হলো গুলাবি গ্যাং

সাম্পাত দেবী চাইলেন এই সংগঠনের নারীদের যেন মানুষজন চিনতে পারে। পোশাকের জন্য একটি রং বাছলেন তারা। তখন থেকেই এই সংগঠনকে বলা শুরু হয় গুলাবি গ্যাং। গুলাবি শব্দের অর্থ গোলাপি।

গুলাবি গ্যাংয়ের কার্যক্রম এখন ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তাদের প্রধান তৎপরতা উত্তর প্রদেশে। সাম্পাত দেবীর প্রায় নজিরবিহীন এই উদ্যোগ, তার সাহসী-স্পষ্টভাষী আচরণে আকৃষ্ট হয়ে বলিউডও গুলাবি গ্যাংকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানিয়েছে।

সাম্পাত পাল দেবী জানান, আমাকে অনেকবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। অনেক অপরাধের সাথে আমাকে জড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আমি কোনোদিন এসবকে তোয়াক্কা করিনি। ভয় পাইনি। আমি জানি একদিন না একদিন আমাকে তো মরতে হবে।

হালে গুলাবি গ্যাং তাদের বাঁশের লাঠি ত্যাগ করেছে। সাম্পাত পাল দেবী বলেন, সহিংস পথের বদলে তারা এখন আলোচনা এবং মিছিল-সমাবেশকে গুরুত্ব দেন। সরকার এবং বিচার বিভাগও আমাদের এখন সহযোগিতা করছে। অপরাধীরা এখন আমাদের নাড়তে ভয় পায়। বরঞ্চ আমি যেখানেই যাই, মানুষজন আমার কাছে এককাপ চা নিয়ে আসে।

সাম্পাত পাল দেবী মনে করেন ভারতে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে হলেও বদলাচ্ছে।

আধুনিক ভারতের নারীদের জন্য এক প্রেরণাদায়ী নাম সাম্পাত পাল দেবী। তিনি ভারতের একজন সাহসী নারী যিনি অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে শুধু রুখেই দাঁড়াননি বরং অন্যান্য নারীদের একত্রিত করেছেন, উৎসাহ জুগিয়েছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। অত্যাচারিত অসংখ্য নারীকে তিনি পথ দেখিয়েছেন নিজের ভাগ্য নিজেকেই গড়ে নিতে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে আর আপন শক্তিতে জ্বলে উঠতে। 

পাঠকের মন্তব্য