'মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সুপারিশ সমুহ'

জেসমিন নাহার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার

জেসমিন নাহার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার

জেসমিন নাহার : শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর প্রাথমিক শিক্ষা হলো জাতি তথা রাষ্ট্র গঠনের মূলভিত্তি। তাই বলা যায় গুনগত ও মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড। এ কথা সত্য যে, সীমিত সম্পদ ও অধিক জনসংখ্যার এ দেশে গুনগত ও মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অসম্ভবকে সম্ভব করার মত একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।

তাই আমার কর্ম অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হলো- 

১. শিশুর শিখন-শেখানোর পরিবেশকে আনন্দ-মূখর ও শিশু-বান্ধব করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। শ্রেণিকক্ষ সমুহ স্বল্প ব্যয়ে হাতের তৈরী বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে চিত্তাকর্ষক ও গ্রহনযোগ্য গড়ে তোলা যেতে পারে।

২. শিক্ষক সহ মাঠ পর্যায়ের জনবলের প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণলব্দ জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না তার ফলোআপ ও মনিটরিং কোন কোন ক্ষেত্রে মেন্টরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকগন অবশ্যই নিজে শ্রবণযোগ্য স্বরে প্রমিত বাংলায় বন্ধুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা বলবেন মৌখিক অমৌখিক ভাব বিনিময়ে ইতিবাচকতার ছাপ থাকবে। শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের সম্পর্ক হবে পেশাগত, ইতিবাচক ও ন্যায়সঙ্গত।

৩. শিক্ষককে অবশ্যই বার্ষিক ও দৈনিক পাঠ পরিকল্পনা প্রনয়ন এবং সে আলোকে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহন করে শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং হাসিমুখে তার উত্তর দিতে হবে। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্তীদের বেশি বেশি করে নিজের ভাষায় তাদেও ভাব প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে।
 
৪. শ্রেণি কক্ষে তিন ধরনের (Slow Learner, Medium Learner, Advanced Learner) শিক্ষার্থীর বিষয়টি অবশ্যই শিক্ষককে মনে রেখে তাদের চাহিদা অনুযায়ী ভারসাম্য পরিবেশে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সিইনএড/ ডিপিএড-এর আলোকে স্তর ভিত্তিক পাঠদান অধিকতর ফলপ্রসু হতে পারে।

৫. বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে যতটুকু সম্ভব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করতে এবং এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ভূমিকা কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
  
৬. ডিজিটাল বাংরাদেশ গড়তে ও টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) নিশ্চিতকরণে সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি কর্মসূচিকে তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়ার আওতায় এনে তা মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

৭. প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রমান্বয়ে পাঠাগার,সীমিত পরিসরে বিজ্ঞান-গবেষণাগার এবং কম্পিউটাল ল্যাব গড়ে তুলতে হবে। তার সাথে সাথে সরকার প্রদত্ত ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। এ কনটেন্ট গুলো অবশ্যই দৃষ্টিনন্দন ও শিশুদের জন্য উপযোগী হতে হবে। তবে শুধুমাত্র মাল্টিমিডিয়ার উপর নির্ভরতা শ্রেণি পাঠদানে সহায়ক হবে না যদি শিক্ষক -শিক্ষার্থী মিতষ্ক্রিয়া এবং এক চিন্তন, জোড়ায় আলোচনা, দলীয় কাজ, হাতে কলমে শিক্ষাদান ও গ্রহন এবং বাস্তব উপকরণ ও অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ পাঠদান না হয়।

৮. শিক্ষার্থীদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য বিদ্যালয়ে গল্প বলা, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, উপস্থিত ও নির্ধারিত বক্তৃতা নিয়মিতভাবে পরিচালনা এবং বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক দিবস উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।

৯. আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতাসহ স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদেরকে উৎসাহিত করা এবং অংশগ্রহনের সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

১০. যে সকল শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না তাদের নিয়মিত খোঁজখবর নেয়া, শিক্ষক ও এসএমসি কর্তৃক কার্যকর হোমভিজিট করা, মা সমাবেশ, উঠোন বৈঠক, শিক্ষক অভিভাবক সভা ও অভিভাবক সমাবেশে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে শিক্ষার্থীদেও নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা। 

১১. বিদ্যালয় সমুহকে শিশুদের জন্য আর্কষণীয় করতে স্লিপার, দোলনা, ও আউটডোর খেলা ধুলার সামগ্রী বৃদ্ধি করা, সাথে সাথে বিদ্যালয়ের আঙিনায় বনজ, ফলজ, ভেজষ এবং বৈচিত্রপূর্ণ রঙ্গিন ও সুগন্ধি ফুলের বাগান শিশূদেরকে বিদ্যারয়ে অবস্থানের প্রতি উৎসাহিত করবে।

১২. সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় সকল বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনগনকে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে হবে।

১৩. দৈনিক সমাবেশে শপথবাক্য পাঠ ও সঠিক তার, লয় ও জাতীয় সংগীত পরিচালনা করা এবং বিদ্যালয় সমুহে কাবিং কার্যক্রম জোড়দার করণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরও মধ্যে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, জাতীয়তাবোধ, চেতনা, নেতৃত্ব, চরিত্র গঠন, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় ইতিবাচক অগ্রগতি সাধন করবে।
 
১৪. দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় সমুহে একই ধরনের কর্মসূচী পরিচালনা করতে হবে। এক্ষেত্রে এনজিও ও ব্যক্তি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠান সমুহকে সরকারী নীতিমালার আওতায় আনতে হবে।

১৫. প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৩০: ১ নিয়ে আসতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য যোগ্য, আন্তরিক, দক্ষ প্রশিক্ষক পুল গঠন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিকরণে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। 

লেখকঃ জেসমিন নাহার
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
নীলফামারী সদর, নীলফামারী।

পাঠকের মন্তব্য