আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ

প্রতিদিন বাড়ছে আতঙ্ক : ঘরে ঘরে ‘চোখ ওঠা’ রোগ

আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ

আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ

দেশের বিভিন্ন জায়গায় চোখ ওঠা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থীও রয়েছে। তবে এ রোগে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে বলছেন। সতর্ক না হলে এ রোগ থেকে কর্নিয়ার আলসার ও অন্ধত্বের মতো গুরুতর অবস্থাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘চোখ ওঠা’ রোগকে কনজাংকটিভা বা চোখের প্রদাহ বলা হয়। এদিকে চোখ ওঠা রোগে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের লেখা পড়ার ব্যাহত ঘটছে। সিলেট সিরাজগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থেকে প্রতিনিধিরা এসব খবর জানাচ্ছেন।

সিলেট : তিন সপ্তাহ থেকে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিটি ঘরেই চোখ ওঠা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। প্রথম দিকে সংক্রমণের হার কম থাকলেও বর্তমানে ব্যাপক হারে বাড়ছে এ রোগীর সংখ্যা। ‘চোখ ওঠার’ সাথে জ্বর ও সর্দি কাশিতে ভুগছেন অনেকে। বিভিন্ন হাসপাতালে ভিড় করছেন তারা। তবে বেশিরভাগই বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সংক্রমনের পর সিলেটজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। 

সিলেট নগরীর তাতীপাড়া এলাকার বাসিন্দা সামিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে হালকা জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হই। পরদিন থেকেই চোখ জ্বালা পোড়া শুরু হয়। তিনদিন পর আমার কমলেও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। একে একে সবাই আক্রান্ত হয়েছেন।’

সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কামালপুর গ্রামের বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, ‘প্রথমে স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে এ রোগটি দেখা দেয়। পরবর্তীতে বাড়ির প্রতিটি ঘরে বিভিন্ন বয়সীরা আক্রান্ত হন। সবাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’

গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মুয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘ঘরের সবাই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কেউ তিনদিনে ভালো হয়েছেন। তবে একই এলাকার অনেকে এক সপ্তাহেও ভালো হননি।’

জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নন্দন কুসুম দাস বলেন, এটি একটি সিজনাল ও ভাইরাসজনিত রোগ। প্রতিবছর দু’বার এমনকি তিনবারও এ রোগের সংক্রমন দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, যদিও চোখ-ওঠা রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক। তবে কারও চোখের দিকে তাকালেই সংক্রমিত হয় না। যদি কোনো সংক্রমিত রোগী চোখ স্পর্শ করে এবং সেই হাত ভালো করে সাবান দিয়ে না ধুয়েই যদি কোনো কিছুতে স্পর্শ করে, তবে ভাইরাস ওই বস্তুতে চলে যায়। এখন যদি অন্য কেউ ওই বস্তু স্পর্শ করে এবং হাত না ধুয়ে চোখ স্পর্শ করে, তাহলে তার চোখও সংক্রমিত হবে। সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললে বা একসঙ্গে কাজ করলে তার থেকে সংক্রমিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ডা. নন্দন কুসুম বলেন, কখনো কখনো চোখ-ওঠা রোগীদের সেকেন্ডারি ইনফেকশন থেকে রক্ষা করতে তাদের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপের প্রয়োজন হয়। তবে বেশিরভাগ রোগী বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে যায়। সাধারণত এটি ৫-১০ দিনের মধ্যে কমে যায়।

তিনি বলেন, এ রোগকে একেবারে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। কখনো কখনো এটি চোখের কর্নিয়ায় ছড়ায়। এতে কর্নিয়ার আলসার এমনকি অন্ধত্বের দিকে চলে যেতে পারে। কর্নিয়ায় ‘ইনফেকশন’ হলে সুস্থ হতে দুই তিনমাস সময় লাগতে পারে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ এ চিকিৎসক আরও বলেন, স্কুলগামী শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত তাকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাসায় রাখা। আর এসএসসি পরীক্ষার্থী কেউ আক্রান্ত হলে তাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। কোনোভাবে যাতে তার ব্যবহৃত কোনো খাতা-কলম অন্য পরীক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে না পারে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সচেতনতাও জরুরি।

জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম আব্দুল আহাদ বলেন, হাসপাতালে শতকরা ১৫ শতাংশ রোগী আসছেন চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত হয়ে। তিনি বলেন, এ রোগে আক্রান্তদের আমরা ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকি। এটি সাধারণত ভাইরাল সংক্রমণের কারণে ঘটে। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১০০ এর বেশি রোগী আসছেন চোখ ওঠার চিকিৎসা নিতে। ওই হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে হাজারের বেশি কনজাংটিভাইটিস আক্রান্ত রোগী সেবা নিয়েছেন। চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগই একই পরিবারের সদস্য।

এ বিষয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ নাজমুল হক বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চোখের মনি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক এবং এন্টিভাইরাল দিয়ে থাকি।

সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. রামপদ রায় বলেন, এই রোগে করনীয় নিয়ে প্রত্যেকটি হাসপাতালে নির্দেশনা দিয়ে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ফরিদ শেখ বলেন, ‘চোখ ওঠার সমস্যাটি ঋতু পরিবর্তনের সময় হয়ে থাকে। তবে এ বছর সংক্রমনের সংখ্যা বেশি। তিনি কালো চশমা ব্যবহারের পরামর্শে দিয়েছেন।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) : মৌলভীবাজার কমলগঞ্জে গত এক সপ্তাহে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন উপজেলার দুই থেকে তিন হাজার মানুষ। হাসপাতালে আক্রান্তদের ভিড় বাড়ছে।

চিকিৎসকরা জানান, কনজাঙ্কটিভাইটিসের লক্ষণ হলো চোখের নিচের অংশ লাল হয়ে যাওয়া, চোখে ব্যথা বা অস্বস্তি। প্রথমে এক চোখ, পরে অন্য চোখও আক্রান্ত হয়। চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে। চোখের নিচের অংশ ফুলে ও লাল হয়ে যায়। আলোয় চোখে অস্বস্তি বাড়ে।

উপজেলা সদর ছাড়াও গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কিছু নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার কথা বলেন তিনি।

চিকিৎসকরা বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহারের রুমাল, তোয়ালে, গামছা, বালিশ অন্যরা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া এটি বাতাসের মাধ্যমেও ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাবান পানি দিয়ে কিছুক্ষণ পরপরই হাত পরিষ্কার করতে হবে। চোখ ভেজা থাকলে টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে নিয়ে অবশ্যই ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতে হবে। হাত দিয়ে চোখে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ধুলাবালু ও ধোঁয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে ড্রপ ও ঔষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া জানান, করোনায় যে রকম স্বাস্থ্যবিধি ঠিক অনেকটাই ওই রকমই মানতে হয়। তবে ড্রপ ব্যবহারের আগে এর মান ও মেয়াদ সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য