প্রয়াত নায়ক রাজ রাজ্জাক-এর জন্মবার্ষিকী আজ 

নায়করাজ রাজ্জাক

নায়করাজ রাজ্জাক

যিনি নায়করাজ রাজ্জাক নামে সুপরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়করাজ উপাধি দিয়েছিলেন। নিজের জন্মস্থান কলকাতায় সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু করেন এবং ১৯৬৬ সালে ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। 

তিনি জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। ষাটের দশকের শেষের দিকে এবং সত্তরের দশকেও তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হত। 

অভিনয় জীবনে তিনি বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নিচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা এবং বড় ভালো লোক ছিলসহ মোট ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি সব মিলিয়ে ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তার মালিকানার রাজলক্ষী প্রোডাকশন থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

মহানায়কের নাম নায়ক রাজ-রাজ্জাক
জন্ম : ২৩ জানুয়ারি ১৯৪২ 
মৃত্যু : ২১শে আগস্ট ২০১৭ 

নায়ক রাজের অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময়ের পথচলা। এসময়ে তিনি দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে প্রায় ৩০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৬৬ সালে বেহুলা সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ঢাকাই সিনেমার তার পথচলা শুরু। আর এ নায়কের সর্বশেষ অভিনীত ছবি ছেলে বাপ্পারাজ পরিচালিত কার্তুজ। ছবিটি ২০১৫ সালে মুক্তি পায়।

আব্দুর রাজ্জাককে কেউ চিনতো না। অথচ তার জন্মই হয়েছে টালিউডে। টালিউড মানে কলকাতা, তথা ভারতের চলচ্চিত্রের আঁতুর ঘর। এখানেই বেড়ে উঠেছেন উত্তম কুমার থেকে সৌমিত্র, প্রসেনজিৎ থেকে শুরু করে হালের দেব কিংবা পরমব্রতরা। টালিউডে জন্ম নেয়া আব্দুর রাজ্জাক অভিনেতা হতে চাইলেন। কিন্তু অভিনয় তো দূরের কথা, তাকে টালিউড ছাড়তে হলো ভাগ্যদোষে। 

১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে আব্দুর রাজ্জাক চলে এলেন ঢাকা। এলেন শরণার্থী হয়ে, কিন্তু বুকে তার স্বপ্ন- অভিনয় করবেন। পকেটে সম্বল মাত্র একটি চিঠি। যে চিঠি কলকাতার এক স্বজনের লেখা; আব্দুল জব্বার খানের প্রতি। আব্দুল জব্বার খানকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্মদাতা বলা যায়। তার প্রযোজনা ও পরিচালনাতেই এই ঢাকা শহরে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। 

আব্দুর রাজ্জাক কমলাপুর এসে ঠাঁই নিলেন। এখানেই থাকেন আব্দুল জব্বার খান। অবশেষে আব্দুর রাজ্জাক দেখা করার সুযোগ পেলেন তার সঙ্গে। এই সাক্ষাত থেকেই শুরু হলো বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন একটি অধ্যায়। এই অধ্যায়ের নাম নায়ক রাজ রাজ্জাক। আব্দুর রাজ্জাককে অবশ্য নায়ক রাজ হতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। ঢাকার কমলাপুরে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে আধবেলা খেয়ে-না-খেয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। আব্দুল জব্বার খান অবশ্য তাকে হতাশ করেননি। তিনি রাজ্জাককে ইকবাল ফিল্মস লিমিটেডে কাজ করার সুযোগ দেন। কামাল আহমেদের উর্দু চলচ্চিত্র ‘উজালা’তে সহকারী পরিচালক হিসেবে শুরু হয় রাজ্জাকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ করার সূচনা। কথাটি এখানে যতটা সহজভাবে আপনি পড়লেন, ততটা সহজ ছিল না। সহকারী পরিচালক থাকা অবস্থাতেই রাজ্জাক অভিনয়ের চেষ্টা করতে থাকেন। 

কলকাতায় খানপুর হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে তিনি সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে নির্মিত নাটক ‘ব্রিদোহী’তে অভিনয় করেন। সেই থেকে তার অভিনয়ের স্বপ্ন। টালিউডেও চেষ্টা করেছেন দুয়েকটা ছবিতে অভিনয় করার। অভিনয়ের নেশাটা আসলে তার রক্তে ছিলো। ‘কার বউ’ ‘ডাকবাবু’ ‘১৩নং ফেকু ওস্তাগার লেন’ ‘আখেরী স্টেশন’ (উর্দু) ইত্যাদি ছবিতে তিনি ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন। বলে রাখা ভালো চলচ্চিত্রজীবনের শুরুতে তিনি এক্সট্রা শিল্পী হিসেবেও সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সে সময় পাকিস্তান টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটকেও তাকে আমরা অভিনয় করতে দেখেছি।প্রতিষ্ঠা পেতে জীবন যুদ্ধ যখন চলমান ঠিক সে সময়, তিনি জহির রায়হানের সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়ে যান। 

জহির রায়হান তখন বাংলার বিখ্যাত লোকগল্প ‘বেহুলা’ বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নায়িকানির্ভর এই ছবিতে নায়ক লক্ষীন্দরকে অধিকাংশ সময় শবদেহ হয়ে শুয়ে থাকতে হবে। তখনকার নামকরা কোনো নায়কই এ চরিত্রে অভিনয় করতে রাজী হলেন না। জহির রায়হানের জহুরি চোখের নজর পড়ল রাজ্জাকের উপর। রাজ্জাক প্রথম নায়ক হওয়ার সুযোগ পেলেন বেহুলা ছবিতে। আর প্রথম ছবিতেই বাজিমাত। বেহুলা সকলের হৃদয় কেড়ে নিলো আর রাজ্জাক নায়ক হিসাবে ঠাঁই পেয়ে গেলেন এ দেশের মানুষের অন্তরে। এরপর কেবল নিজের সীমানাকে অতিক্রম করে পথ চলা। একের পর এক বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন নতুন মাইল ফলক তৈরি করে হয়ে উঠলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক। ৫০ বছরের চলচ্চিত্র জীবনে দুই বাংলা মিলিয়ে প্রায় পাঁচশটি উর্দু-বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ রাজ্জাক এক বৈচিত্রময় নাম। তিনি নায়কের চিরচেনা রূপ ভেঙেছেন বহুবার। 

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত প্রথম সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’-এ তিনি অভিনয় করেছেন ভিন্ন ধরণের চরিত্রে। ‘আলোর মিছিল’ চলচ্চিত্রে রানা মামা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সহ-চরিত্রকে দেন ভিন্ন মাত্রা। উল্লেখ্য এ ছবিতে ববিতার মামা হন তিনি। ববিতার প্রেমিক হিসেবে এ ছবিতে অভিনয় করেন ফারুক। রাজ্জাক চাইলেই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন, কিন্তু ভিন্নতার জন্যেই তিনি মামার চরিত্রটি বেছে নেন। ১৯৭৪ সালে চিত্রনায়ক সোহেল রানা বাংলাদেশের বিখ্যাত থ্রিলার উপন্যাস ‘মাসুদ রানা’ অবলম্বনে একই শিরোনামে চলচ্চিত্র বানান। কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে সোহেল রানার যাত্রা শুরু হয়। আর এ ছবিতে ক্লাবের গায়ক হিসেবে একটি দৃশ্যে অভিনয় করেন রাজ্জাক। নতুন একজন পরিচালক-নায়কের ছবিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা নায়কের এমন ভিন্ন একটি চরিত্র অসাধারণ দৃষ্টান্ত। ১৯৭৩ সালে ‘রংবাজ’ ছবিতে মাস্তানের চরিত্রে অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রে এ্যাকশন ঘরানার শুরু করেন নায়ক রাজ রাজ্জাকই। 

১৯৭৮ সালে আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ এবং ১৯৮০ সালে ‘ছুটির ঘণ্টা’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। প্রথম ছবিটিতে গ্রাম্য পাহারাদার আর ছুটির ঘণ্টায় স্কুলের দপ্তরির চরিত্রে অভিনয় সে সময়ের বিবেচনায় একজন সাহসী অভিনেতার কাজ ছিলো। শিশুতোষ এই দুটি ছবিতেই তিনি নায়কের প্রচলিত ভাবনা ভেঙে দিয়েছেন। অভিনয়ের জন্য তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কি যে করি (১৯৭৬), অশিক্ষিত (১৯৭৮), বড় ভালো লোক ছিল (১৯৮২), চন্দ্রনাথ (১৯৮৪) এবং যোগাযোগ (১৯৮৮) চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। 

অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন। এর বাইরেও পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূতও হয়েছেন তিনি।এক সময়ের আব্দুর রাজ্জাক একদিন টালিউডে ফিরে গেলেন। যে টালিউডে তিনি থাকতে পা রেননি, সেই টালিউড তাকে বরণ করে নিলো রাজার মতোই। এখন তো তিনি বেড়ে উঠতে যাননি, বরং টালিউডের সীমানাটাই আরেকটু বড় করে দিয়ে এসেছেন। টালিউডেও নায়ক রাজ্জাক সৃষ্টি করলেন একাধিক মাইলফলক। প্রযোজক রাজ্জাক : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আরো বেগবান হয়েছে নায়ক রাজ রাজ্জাকের রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের কল্যাণে। নিজের এবং স্ত্রীর নাম মিলিয়ে তিনি তৈরি করেন এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। অনন্ত প্রেম, পাগলা রাজা, চাঁপাডাঙার বউ, মৌচোর, বাবা কেন চাকর-এর মতো সফল চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে তার প্রযোজনা সংস্থা থেকে। 

শুধু সিনেমা তৈরিই নয়, প্রযোজক হিসেবে তিনি অরুণা বিশ্বাস, পুত্র বাপ্পারাজকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। খল অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানকে তিনি চাঁপাডাঙার বউ চলচ্চিত্রে শাবানার বিপরীতে অভিনয় করিয়ে নতুন ইমেজ তৈরি করেন। ছোট ছেলে সম্রাটও তার হাত ধরে চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করে। রাজলক্ষ্মী প্রোডকশন থেকে ২০টি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। এই প্রোডাকশন থেকে তৈরি হওয়া চলচ্চিত্র ‘বাবা কেন চাকর’ এতটাই সফল হয়েছির যে, পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে এই চলচ্চিত্র আবার নির্মিত হয়। উল্লেখ্য, বাবা কেন চাকর প্রযোজনার সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প অশ্লীলতার অন্ধকারে ছিলো। সেই অন্ধকার সরাতে চলচ্চিত্রটি বিরাট ভূমিকা রাখে। এরপর তিনি ‘আরএস এন্টারটেইনমেন্ট’ নামে আরেকটি প্রযোজনা সংস্থা গড়ে তোলেন। 

এই প্রযোজনা সংস্থা থেকেও আমি বাঁচতে চাই, কোটি টাকার ফকির ও মন দিয়েছি তোমাকে-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। পরিচালক রাজ্জাক : ভুলে গেলে চলবে না, চলচ্চিত্রে নায়ক রাজের যাত্রাটা শুরু হয়েছিলো পরিচালকের সহকারী হিসেবে। কাজেই পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালনা করাটা তার জন্য খুবই স্বাভাবিক। এখন পর্যন্ত রাজ্জাক ১৮টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন যার অধিকাংশই তার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত। অনন্ত প্রেম, বদনাম, চাঁপাডাঙার বউ, মৌচোর, সৎ ভাই, বাবা কেন চাকর, জ্বিনের বাদশা, কোটি টাকার ফকির, মন দিয়েছি ইত্যাদি তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। পরিচালক হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র ‘অনন্ত প্রেম’ দিয়েই তিনি তার নিজস্বতা প্রমাণ করেন। 

গল্প নির্বাচন, দৃশ্যায়ণ, চরিত্রায়ণ সব মিলিয়ে ‘অনন্ত প্রেম’ কালজয়ী আসনে ঠাঁই পেয়ে যায়। এই চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকার মৃত্যু দেখানো হয়েছে। সে সময়ের বিবেচনায় এটি একটি সাহসী সিদ্ধান্ত ছিলো। বাংলাদেশের ছবির দর্শক মিলনই দেখে এসেছে এতোকাল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাপা ডাঙার বউ’কে সিনেমার পর্দায় তিনি তুলে আনেন। এছাড়াও নীহাররঞ্জন গুপ্তের কালজয়ী উপন্যাস ‘উত্তর ফাল্গুনী’কে তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দেন।

পাঠকের মন্তব্য