বাংলাদেশের কৃষক আত্মপ্রত্যয়ী, সংযমী ও ধৈর্যশীল 

মিয়া মনসফ, কলামিস্ট ও সভাপতি, কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা।

মিয়া মনসফ, কলামিস্ট ও সভাপতি, কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা।

মিয়া মনসফ : এদেশের কৃষক আত্মপ্রত্যয়ী, বাংলার কৃষক সংযমী, বাংলাদেশের খেটে খাওয়া কৃষিজীবী মানুষ ধৈর্যশীল সেই প্রমাণ পাওয়া গেলো বগুড়ায় এবি ব্যাংকের স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে কৃষি ঋণ বিতরণ কর্মসূচির অনুষ্ঠানে।
 
এবি ব্যাক চলতি বছরের শুরু থেকে স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণ শুরু করে। উদ্দেশ্য বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যে খাদ্য সংকট সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে তা মোকাবেলা করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে খাদ্য উত্পাদনের যে নিদের্শনা দিয়েছেন তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে এবি ব্যাংক এই ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজালের পরিকল্পনায়। 

এবি ব্যাংকের ধারাবাহিক ঋণ বিতরণ কর্মসুচির অংশ হিসেবে বগুড়া সদরে শহীদ টিটু পৌর মিলনায়তনে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ১০০০ কৃষক স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা পাবে সম্পূর্ণ কোন জামানত ছাড়া। অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা ছিল বেলা একটায়। কিন্তু প্রধান অতিথি অত্র এলাকার সাংসদ রাগেবুল আহসান রিপু তাঁর রাষ্ট্রীয় কাজের কারণে ঢাকা থেকে আসতে বিলম্ব হয়ে যায়। নির্ধারিত অনুষ্ঠান প্রায় তিন ঘন্টা বিলম্বে শুরু হয় মাননীয় সংসদ সদস্য অনুষ্ঠানে পৌঁছার পর। এই সময়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষক কিষানীরা এসে জড়ো হয়েছেন সেই সকাল এগারোটা থেকে। তাদের চেহারায় চোখে মুখে হাসির ঝিলিক লক্ষ্য করেছি প্রথম থেকে। অনুষ্ঠান শুরুর বিলম্বের কারণে কিছুটা বিষন্ন দেখা যায় কৃষকদের কারো কারো মধ্যে ! 

অনুষ্ঠান বিলম্বের সুযোগে কয়েকজন কৃষক কিষাণীর সাথে কথা বলার সুযোগ নিলাম। স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে ঋণ প্রাপ্তিতে তাদের প্রতিক্রিয়া জানার আগ্রহ থেকে কথা হয় বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত ঋণপ্রত্যাশীদের সাথে।

সারিয়াকান্দি উপজেলার হাওড়াখালি গ্রামের কৃষক ওসমান গনি। তিন সন্তানের জনক। বড় ছেলে বিএ অনার্সের ছাত্র। আরো দুই মেয়ে কলেজ ও স্কুলে পড়ে। আড়াই একর জমি আছে ওসমান গনির। চাষাবাদই তার আয় রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। নিজের জমিতে কৃষি কাজ করে সংসার চালান। ছেলে সন্তানদের মানুষ করছেন। ওসমান গনির কাছে জানতে চাইলাম, এবি ব্যাংক থেকে যে লোন পাবেন তা কৃষির কোন কাজে লাগাবেন!

ওসমান গনি জানালেন, আমার জমিতে ধান ও বিভিন্ন সবজির চাষ করে থাকি। টাকার অভাবে ঠিক মতো চাষাবাদ হয়না। কৃষক ওসমান গনি জানতে চাইলেন কত টাকা লোন পাবো!

আমি বললাম, যদ্দুর জানি সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাবেন।

এক লক্ষ টাকার কথা শুনে ওসমান গনি একটু মন খারাপ করলো মনে হলো। ওসমান গনির প্রত্যাশিত ঋণ পাবেন এমন উত্সাহ দিতে, আমি বলার চেষ্টা করলাম, আপনি যদি এক লক্ষ টাকা পান, সেই টাকা কাজে লাগিয়ে যথাসময়ে যদি ফেরত দিতে পারেন, তাহলে আপনি পরবর্তীতে আবার ঋণের জন্য আবেদন করলে আপনাকে আবার ঋণ দেওয়া হবে। আমার কথা শুনে ওসমান গনির চেহারায় খুশির ঝলক প্রত্যক্ষ করেছি।

রাজাপুরের কিষাণী রেণু বেগম। তিন কন্যার সন্তানের মা। তিন মেয়ে উচ্চ শিক্ষিত। বিয়ে হয়ে ওরা সংসারী। স্বামীকে নিয়ে কৃষি কাজ করেন রেনু বেগম। নিজের জমিতে চাষ করে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকি ফসল বিক্রি করেন। 

ইতিমধ্যে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাগেবুল আহসান রিপু এমপিকে সাথে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে এসেছেন এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজাল।

সোয়া চারটায় কোরান তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হলো অনুষ্ঠান। বিশেষ অতিথি সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ফিরোজা পারভীনের বক্তব্যের  মধ্য দিয়ে শুরু হয় আলোচনা পর্ব। তিনি বিলম্বে অনুষ্ঠান শুরুর কারণে কৃষকদের কষ্টের কথা বিবেচনায় রেখে খুব সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে তাঁর বক্তব্যের ইতি টানার ঘোষণা দিলেন। তখন পুরো মিলনায়তন ভর্তি শ্রোতা কৃষক কিষাণী করতালি দিয়ে মুখর করে তুললেন তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের জন্য। 

ফিরোজা পারভীন মাত্র তিন মিনিটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বলেন, এই দেশ যে উন্নত বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা প্রমাণ হলো এবি ব্যাংকের স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে এই ঋণ বিতরণ কর্মসূচি। আজ আমাদের কৃষকদের লোন দেয়া হবে স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে। তাঁরা যখন তখন যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু টাকা ব্যাংক থেকে তুলে ঋণের টাকা তুলে খাদ্যোত্পাদনে ব্যবহার করবেন। আমাদের এই কৃষকরাই আমাদের এই দেশটাকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর, বগুড়া খামারবাড়ির উপ-পরিচালক মতলুবর রহমানের বক্তব্যের প্রতিটি পরতে পরতে কৃষকদের করতালিতে মুখর হলো পুরো মিলনায়তন। তিনি প্রথমেই দেশের মানুষ খাদ্যাভাবে যাতে কষ্ট না পায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, কৃষি উত্পাদনের ভর্তূকি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার কথা তুলে ধরেন। কৃষি উত্পাদনে কৃষকদের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত উল্লেখ করে কৃষির সাফল্যের কথা যখন মতলুবর রহমান তুলে ধরলেন, তখন তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হর্ষধ্বনি ও করতালিতে অভিষিক্ত করলেন কৃষকরা।

বগুড়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, ঋণপ্রাপ্ত কৃষকদের আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা ঋণের টাকা শুধু কৃষি কাজে ব্যবহার করবেন। এমন বক্তব্যে কৃষকরা হাত তুলে তাদের সম্মতির কথা জানান।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যের সময় অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে উপস্থিত শ্রোতাদের বক্তব্য শোনার আগ্রহ দেখে বোঝা গেলো তিনি এই নির্বাচনী এলাকার মানুষের কত প্রিয়! কত আপন!

এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজালের তাঁর প্রাঞ্জল ভাষণের সময় দু’টি ভিডিও চিত্র উপস্থিত কৃষক কিষাণীকে তাঁর বক্তব্য শ্রবণে আগ্রহী করে তোলে। তাঁর বক্তব্যের ফাঁকে এবি ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। বক্তব্যের শেষভাগে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় শেখ হাসিনার অবদানের কথা তুলে ধরা ভিডিও চিত্র উপস্থাপনের পর মিলনায়তন ভর্তি কৃষকদের করতালিতে পরিবেশটিকে আনন্দঘন পরিবেশে পরিণত করে। সবশেষে কয়েকজন কৃষক কিষাণীকে স্মার্ট কার্ডে ঋণ বিতরণ করে সহস্র কৃষককে ঋণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করা হয়। 

সবশেষে দূরদূরান্ত থেকে আগত কৃষকদের হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দেয়া হয় এবি ব্যাংকের পক্ষ থেকে। মিলনায়তন থেকে কৃষক কিষাণীদের বিদায়লগ্নে এবি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা এস এম আজাদ ও মো: তারিকুল ইসলাম তাঁদের হাস্যোজ্জল মুখে কৃষকদের বিদায় সম্ভাষণে দীর্ঘ বিলম্বের ক্লান্তি ভুলে একবুক প্রত্যাশা নিয়ে বাড়ি ফেরে ঋণপ্রত্যাশী কৃষকরা। এবং এবি ব্যাংকের বগুড়ার কৃষকদের মাঝে স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কর্মসূচির সফল পরিসমাপ্তি ঘটে।

লেখক : কলামিস্ট ও সভাপতি, কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা।

   


পাঠকের মন্তব্য