ইমরানকে পরামর্শ দিলেন পারভেজ মুশারফ

ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার জন্য পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উপর চাপ বাড়ছে। বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব, ভারতের সামরিক শক্তি ও আর্থিক ক্ষমতার ব্যাপকতা লক্ষ্য করেই ইমরানকে এই পরামর্শ দিয়েছেন পাকিস্তানের তিন জন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশারফ। তিন পাকিস্তানি কূটনীতিক হলেন, প্রাক্তন পাক বিদেশ সচিব রিয়াজ হুসেন খোকর, রিয়াজ মহম্মদ খান এবং ইনামুল হক। প্রাক্তন পাক সেনাপ্রধান মুশারফ যেমন পাকিস্তানের পরমাণু ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন, তেমনি ওই তিন পাক কূটনীতিক বলেছেন, ভারতের আগ্রাসনের জবাব ভারসাম্যের সঙ্গেই দিক ইমরান খানের সরকার।

পুলওয়ামার হামলার পর ভারত বদলা নিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালানোর চেষ্টা করলে সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করার ও ভারতকে জবাব দেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন ইমরান। এর জেরে পাক সংবাদমাধ্যমের সামনে চলে আসে পরমাণু যুদ্ধের প্রসঙ্গও। সেই প্রসঙ্গে ভারত-পাক যুদ্ধের আবহে ইমরানকে সতর্ক করে এ বার মুখ খুললেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা প্রাক্তন পাক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশারফ। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের কারিগর তথা মূল হোতা মুশারফ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভারতকে চিনেছেন হাড়ে হাড়ে। তার ভিত্তিতেই দুবাইয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, 'ভারত-পাক সম্পর্ক ফের বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। 

কিন্তু পাকিস্তান একটা পরমাণু বোমা ফেললে, ভারত ২০টা ফেলবে এবং পাকিস্তানকে একেবারে মুছে দেবে। আশা করি কোনও পরমাণু হামলা হবে না। কিন্তু মনে রাখবেন আমরা (পাকিস্তান) যদি একটা পরমাণু বোমা ভারতে ফেলি, তাহলে ভারত একসঙ্গে ২০টা বোমা ফেলে আমাদের ধ্বংস করে দেবে।' পাকিস্তানের পারমাণবিক সামরিক ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মুশারফ। তিনি বলেছেন, ''ভারতকে আক্রমণ করতে হলে অন্তত ৫০টি পরমাণু বোমা প্রথমেই ফেলতে হবে। যাতে ভারত ২০টা পরমাণু বোমা ফেলার আগেই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এই ৫০টি বোমা নিয়ে আগে হামলা করতে কি আপনারা (পাকিস্তান) প্রস্তুত?''

এই অবস্থায় রবিবার জনপ্রিয় পাক সংবাদপত্র 'ডন'-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তার শিরোনাম 'এখন সংযমের সময়'। তাতে ওই তিন প্রবীণ পাক কূটনীতিক ভারত নিয়ে তাঁদের মতামত দিয়েছেন। তাঁরা একই মত প্রকাশ করে লিখেছেন, ভারতের যে কোনও আগ্রাসনের মোকাবিলা করার জন্য প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তৈরি রাখুক পাকিস্তান। কিন্তু 'আগ বাড়িয়ে' পাকিস্তান যেন কখনওই ভারতের বিরুদ্ধে কোনও হামলা না করে। তাহলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে দোষী সাব্যস্ত করে ভারত ফায়দা তুলবে। সেখানে তাঁরা লিখেছেন, এখন দুই দেশের সম্পর্ক 'বিপজ্জনক' অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়াটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। 

কারণ ভারত ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক সব মঞ্চে পাকিস্তানকে ভিলেন বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে। নদীর জল বন্ধ করে, সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করে, পণ্যে অস্বাভাবিক শুল্ক চাপিয়ে, আর্থিকভাবে পাকিস্তানকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে নয়াদিল্লি 'শিক্ষা' দিতে চাইছে। পাকিস্তানের ক্রোধকে উসকে দেওয়ার পক্ষে এটাই যথেষ্ট। কিন্তু ইসলামাবাদ ক্রুদ্ধ হয়ে এখন যদি সত্যিই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে 'বিরাট ভুল' করবে। কারণ এখন সংযমের সময়। পাকিস্তান আর্থিকভাবে খুব দুর্বল। ভারতের যুদ্ধের ফাঁদে পা দেওয়া উচিত হবে না। এমনটাই মত ওই পোড়খাওয়া পাক কূটনীতিকদের।

তাঁরা লিখেছেন, মুম্বইয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারত সংযম দেখিয়েছিল। কারণ, তখন ভারতে অন্য সরকার ছিল। পুলওয়ামার হামলা মুম্বইয়ের তুলনায় বড় ঘটনা নয়। কিন্তু এখন ভারতে একটি আগ্রাসী সরকার রয়েছে। এরা পাকিস্তানকে দোষী সাব্যস্ত করে সামরিক আগ্রাসন চালাবে। তাঁরা লিখেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত বলছেন, ভারতে পুলওয়ামার উপযুক্ত বদলা নিতে গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে কঠোর নজরদারি চালাক পাকিস্তান। ভারতের আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে সবরকমভাবে তৈরি থাকুক। কিন্তু পাকিস্তান যেন আগেভাগে আক্রমণ না করে। যদিও পাক বিদেশমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি এদিন বলেছেন, পাকিস্তান শান্তি চায়। কিন্তু ভারতই যুদ্ধ জিগির তুলছে। ভারত জেনে রাখুক, এভাবে যুদ্ধ জিগির তুলে আমাদের উপর চাপ বাড়িয়ে লাভ হবে না। 

মুশারফ ও তিন পাক কূটনীতিকের বক্তব্য যখন ফলাও করে পাক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তখনই 'ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল' তৈরি করে অবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল পুলওয়ামা নিয়ে 'ব্যাকফুটে' থাকা ইমরান খানের সরকার। পাক বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র মহম্মদ ফয়জল 'দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন' পত্রিকাকে জানিয়েছেন, এই সেল ভারত সংক্রান্ত পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রেখে প্রতি মুহূর্তের সব আপডেট দেবে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে। ভারতের সঙ্গে সংকট শান্তিপূর্ণ উপায়ে মেটানোর চেষ্টা করবে।

পাঠকের মন্তব্য