শারিরীক কাঠামো ছাড়া নিজেকে কখনো নারী মনে করিনি

উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. সরিফা সালোয়া ডিনা

উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. সরিফা সালোয়া ডিনা

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) এক যুগের ইতিহাসে প্রথম উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. সরিফা সালোয়া ডিনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যাপক ও গ্রেড-১ অধ্যাপক, হল প্রাধ্যক্ষ সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনেক প্রথমের সাথে জড়িয়ে রয়েছে যার নাম।শারিরীক কাঠামো ছাড়া নিজেকে কখনো নারী হিসাবে বিবেচনা করেননি।বরং একজন সচেতন, প্রগতিশীল, আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর এ বোধটি তৈরি হয়েছে তার আদর্শবাদী স্কুল শিক্ষক বাবার কাছ থেকে।এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, "বাবা কখনো আমাকে এ কথাটি ভাবতে শিখাননি যে, তুমি একজন মেয়ে" বাবার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলেছি। আবার তার সংস্কৃতি মনা বাবার হাত ধরেই প্রথম থিয়েটার যাত্রা শুরু করেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। সেই ছোট বেলায় বাবা গাইবান্ধা শিশু একাডেমি তে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ১৯৮৫সালে উপজেলা, জেলা, বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক সহ শিশু একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

শিক্ষাজীবনে অসম্ভব মেধাবী শিক্ষার্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ৫ম, ৮ম শ্রেণীতে মেধাবৃত্তি পাওয়ার পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসি তেও বোর্ড থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন। ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পুরো স্নাতকে তার বেতন মওকুফ ছিলো। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সেরা রেজাল্ট অর্জন করে আসাদুজ্জামান স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। 

১৯৯৬ সালের ৯ই জুলাই কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে সহকারী অধ্যাপক-সহযোগী অধ্যাপকের ধাপ পেরিয়ে ২০০৮ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন।নারী জাগরণের অগ্রদূত, মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের নামে প্রতিষ্ঠিত উত্তরবঙ্গের বাতিঘর খ্যাত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিন পর ২০০৯ সালে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রথম কোন অধ্যাপক।বেরোবিতে যোগদান করার পর বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট অনেক প্রথমের সাথে তার নামটি জড়িয়ে/যুক্ত হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্ছ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট সভার প্রথম কোন নারী সদস্য হিসাবে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রথম হল প্রভোস্ট, নারী পুরুষ মিলিয়ে ২য় এবং নারী হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম ডিনের দায়িত্ব পালন করেন, সেইসাথে নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পান, শিক্ষক সমিতিতে সভাপতি সহ বিভিন্ন পদে তিনি প্রায় প্রতিবারই লড়াই করেন এবং মাঝখানে কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে, বেরোবির এক যুগের ইতিহাসে তিনিই প্রথম উপ উপাচার্য। 

তবে এই পথচলা কখনো মসৃণ ছিলোনা।চলার পথে নানা প্রতিকূলতার মাঝে বিশ্বাস ছিলো 'আমি পারি, আমি পারবো'। এ বোধ সাহস যুগিয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমি এখনো ছুটে চলছি।শিক্ষাজীবন থেকে কর্মক্ষেত্র কখনো কোথাও নারী হিসেবে সুবিধা ভোগ করিনি। বাসে নারীদের জন্য সংরক্ষিত সীটে যাতায়াত করতে ভীষণ অপছন্দ। নারী পুরুষ নির্বিশেষে লাইনে দাড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করি। কর্মক্ষেত্রে নারী হিসেবে সুবিধা গ্রহণ করিনি বলেই,কোন সহকর্মী কখনো নারী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ পাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগদান করার পর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছি।দীর্ঘ কর্মজীবনে "আপনি তো নারী, বাসায় ফিরবেন কখন, আপনার বাসায় ছোট একটা বাচ্চা আছে,তার অসুবিধা হবেনা" কেউ এ কথাগুলো বলার সুযোগ পাননি আবার স্বামী একই বিভাগের অধ্যাপক পরিমল চন্দ্রের আকুন্ঠ সমর্থন থাকায় নিজেও কখনো এ বোধ করিনি।

একসাথে এতকিছু করতে গিয়ে অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু থেমে যাননি। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমি যদি কর্মক্ষম না হতাম,রাতকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতাম,সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে অথবা অপ্রয়োজনে ক্যাম্পাসে থাকা যাবেনা, এ ধরনের মানুষিকতা পোষণ করতাম তাহলে অন্যরাও নারী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ পেত।

নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে বরাবরই স্বোচ্ছার ছিলেন অধ্যাপক ডিনা।আলাপচারিতার এক পর্যায়ে অতীত স্মৃতি থেকে মন খারাপের একটি গল্প শোনান।তার মুখেই শোনা যাক সে ঘটনার বিবরণ "কুষ্টিয়ায় থাকাকালীন সময়ে একদিন পোস্ট অফিসে গিয়ে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল।পোস্ট অফিসে আমার কাজটি শেষ হতে দেরী হচ্ছিলো বিধায় অফিসের বাইরে হাটাহাটি কইতেছিল। এমন সময় খেয়াল করলাম একটি মেয়ের সাথে পাশে দাড়ানো দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবী পরিহিত একজন কথা বলছেন। হঠাৎ খেয়াল করে দেখি মেয়েটি কাদতে শুরু করেছে। আমি সামনে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারি, তা সত্যিই ব্যাথিত করেছিলো! ভীষণ আহত করেছিলো।মেয়েটির চুল ছোট ছিল বলে, সামনে থাকা পুরুষ লোকটি খারাপ আচরণ করে এখং ধমক দিয়ে জানতে চায়, 'এভাবে চুল কাটছেন কেনো, এভাবে চুল কাটা অন্যায়, মেয়ে হিসেবে পর্দা করবে, ঘরে থাকবে, ধর্ম মানবে' এসব কথা বলে উচ্চ স্বরে শাসাচ্ছিলো। আমি তখন চুপ থাকতে পারিনি। আমি কঠিন ভাষায় জানতে চাই, অপরিচিত একটা মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলার কারণ কি।যুক্তি ও রাগ দেখিয়ে সেদিন সেই পুরুষ লোকটিকে বুঝাতে সক্ষম হই যে এটা অন্যায়। সেইসাথে মেয়েটিকে বাসায় পৌছে দিতে দিতে এটা বুঝিয়ে দেই এভাবে কান্নাকাটি করে লোকটিকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।নিজেকে শক্ত হতে হবে, নিজের চলার পথ নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে।
 
সমাজ ও রাষ্ট্রের পিছিয়ে থাকা ও সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত নারীদের জন্য নারী দিবসের প্রয়োজনের কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে জানান এ অধ্যাপক।সমাজে এখনো নারীদের একটা বড় অংশ পরিচয় সংকটে ভোগে। স্বামী কিংবা পিতার পরিচয়ে পরিচিত হতে হয়। আমাদের মেয়েরাও ও মায়েরা নিজের অসুখের কথা বলতে সংকোচ বোধ করে।মেয়েরা এখনো স্বামীকে রেখে মাছের মাথা খাওয়ার কথা ভাবতেই পারেনা। ফলে নারী দিবসের প্রয়োজন।কেনোনা এই দিনটা নারীর প্রতি যে অসংগতি আছে সেই কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়।

জীবনের একটা পর্যায়ে এসে এখন তিনি বুঝতে পারেন, একটা শ্রেনী নারীকে উশৃঙ্খল বানাতে চায়, আরেকটা শ্রেণী বিভিন্ন অজুহাতে ঘরের ভেতরে আবদ্ধ রাখতে চায়।নারীরা স্বাধীনতার নামে যেমন ভোগ্যপণ্যতে পরিণত হচ্ছে তেমনি  ভোগ্যপণ্য হওয়ার ভয় দেখিয়ে আরেকটা অংশ নারীকে ঘরে আবদ্ধ রাখছে। এ দুইটার কোনটাই আমাদের কাম্য নয়।

আমাদের কাম্য নারী দেশে দেশে সেই দেশের উপযোগিতা অনুযায়ী তার নিজেস্ব চিন্তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা অর্জন করবে এবং প্রতিষ্ঠিত করবে।এ সময় তিনি জানান, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে অনেক নারীই ঘরের বাইরে। হয়তোবা সেটা সত্য।কিন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর উপস্তিতি খুবই নিম্নগামী। তবে নারীরাও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে সেটা কেবল শাড়ির রং লাল হবেনা নীল, শপিংয়ে যাবে কি না, এর বাইরে বিয়ে করবে কি না, চাকুরী বাছাই করার স্বাধীনতা, বাড়ি বানাবে কি না, সন্তানদের বিয়ে সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ নেই।তিনি মনে করেন নারীর চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন সময় সাপেক্ষ।তবে নারী না চাইলে সমাজ স্বাধীনতা দিবেনা বরং কেড়ে নিবে।

পাঠকের মন্তব্য