‘শিশুরা আছে বলেই বোধহয় পৃথিবীটা এখনো সুন্দর’

‘শিশুরা আছে বলেই বোধহয় পৃথিবীটা এখনো সুন্দর’

‘শিশুরা আছে বলেই বোধহয় পৃথিবীটা এখনো সুন্দর’

শরিফুল হাসান : শিশুরা আছে বলেই বোধহয় এই পৃথিবীটা এখনো অনেক বেশি সুন্দর। তেমনি একটা ঘটনা শুনুন। করোনাকালে বিভিন্ন দেশের মানুষের দুর্দশা সম্পর্কে জানতে গিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের কথা জানতে পারে জাপানি চার শিশু সুজুকি, আন, তাইকি ও ইয়ুকি। এদের  সবার বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।  সবাই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী। 

এই চার শিশু রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে থাকা শিশুদের জন্য ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ নামে তহবিল খোলে। শুরুতে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ১ লাখ ইয়েন বা আনুমানিক ৯০০ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করে সেই টাকায় লেখাপড়ার সামগ্রী কিনে বাংলাদেশে পাঠানো। কিন্তু ক্রাউড ফান্ডিংয়ে যে এত সাড়া পাওয়া যাবে, তা ওরা ভাবতে পারেনি। 

গত বছর আগস্ট মাস থেকে শুরু করে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন ডলারের (৩০ লাখ ইয়েন) বেশি অর্থ জমা পড়ে তহবিলে। জাপানের দৈনিক পত্রিকা মায়নিচি শিম্বুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য এ বছর জানুয়ারিতে ওই চার শিশুকে ‘সিটিজেন অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার দেওয়া হয়। 

তহবিলে জমা হওয়া অর্থ কীভাবে খরচ করলে ভালো হবে, সেই উপদেশ নিতে দলের সবচেয়ে বড় সদস্য—১২ বছর বয়সী সুজুকি টেলিফোনে বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতোর সঙ্গে কথা বলে। রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে সোমা। রাষ্ট্রদূতের পরামর্শে মোট জমা হওয়া অর্থ কয়েকটি অংশে ভাগ করে প্রতি তিন মাস অন্তর বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় শিশুরা। এরপর ৪ লাখ ইয়েন বা ৩ হাজার ৬০০ ডলারের প্রথম চালান জানুয়ারি মাসে তারা শরণার্থীশিবিরের একটি কার্যালয়ে পাঠায়, যা দিয়ে রোহিঙ্গা  শিশুদের জন্য খাতা, স্কুলব্যাগ এবং বইপত্র কেনা হয়। 

গতকালই আরেকটা খবরে অভিভূত হলাম। ১১ বছর বয়সী একটি শিশু জানতে পারে তার ক্যানসার এবং সে আর বাঁচবে না। ওই শিশুটি  মারা যাওয়ার একটি বাচ্চাকে তার কিডনি এবং আরেকটি বাচ্চাকে তার চোখ দান করে যায়। শিশুটির মৃত্যুর পর ডাক্তার এবং নার্সরা মাথা নিচু করে শিশুটিকে সম্মান জানায়। 

আমি মহৎ মানুষদের জীবনী পড়ে দেখেছি, এই পৃথিবীর যারা বড় মানুষ দেখবেন বেশিরভাগই শৈশব কৈশোর থেকে পৃথিবী আর মানুষ নিয়ে ভাবতেন। তারা সেই মূল্যবোধ শিখতেন পরিবার ও সমাজ থেকে।  আসলেই মূল্যবোধ শেখার সবচেয়ে বড় জায়গা পরিবার। কিন্তু বাবা-মারা সন্তানদের বললেই কী তারা শিখে যাবে ? 

মনে রাখবেন, সন্তানকে যতোই ভালো উপদেশ দেই না কেন, ওরা কিন্তু আমাদের জীবনকে অনুসরণ করবে, উপদেশকে নয়। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। আপনি অসৎ পথে আয় করবেন, হারাম খাবেন আর সন্তানকে সততার কথা বলবেন তাতে কাজ হবে না। আপনার সন্তান যখন দেখবে আপনি একটা চাকুরি করেন কিন্তু বেতনের চেয়ে আপনার খরচ বেশি, ঘুষের আয়, আপনার সন্তান কিন্তু আপনাকে শ্রদ্ধা করবে না। তার মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি হবে না। 

পাশাপাশি শিশুরা দেখে আপনারা কী নিয়ে কথা বলছেন। দেখেন, ১৫ বছর বয়সী সুইডিশ কিশোরি গ্রেটা থুনবার্গের কথা জানি যে সারা বিশ্বের পরিবেশ নিয়ে ভাবছে। পৃথিবীকে বাঁচাবার জন্য লড়ছে। এটা কিন্তু এক দিনে হয়নি। সে তার চারপাশ থেকে শিখেছে কেন পরিবেশের যত্ন নেয়া জরুরী। কিন্তু আমাদের এখানে আমরা কী করি? কী নিয়ে আলোচনা করি ? কী দেখে আমাদের সন্তানরা চারপাশে? কয়জন আমরা আরেকজনের বিপদে দাঁড়াই আমরা? কয়জন নারীদের সম্মান করি। আমাদের সমাজ আমাদের কী শেখাচ্ছে ? এলাকায় কাদের দাপট ?  আচ্ছা বলেন তো আমাদের শিশু-কিশোররা কাদের দেখে শিখবে ? তাদের সামনে আইকন কে? 

আমাদের সবার মনে রাখা উচিত, আমরা নিজেরা ভালো না হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ভালো করা কঠিন। কাজেই চলুন আমাদের সন্তানদের আমরা ভালো মানুষ বানাই। মূল্যবোধ শেখাই। আর সবার আগে সেটা পরিবার থেকেই করতে হবে। আর সেটা শেখাতে হলে নিজেদের মুল্যবোধের চর্চা জরুরী। কাজেই চলুন আগে নিজেদের বিবেক জাগ্রত করি। জাপানি চার শিশুর জন্য ভালোবাসা। ভালোবাসা পৃথিবীর সব শিশুদের জন্য। শুভ সকাল বাংলাদেশ।

লেখক : শরিফুল হাসান- ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; ডেইলি স্টার
ফেসবুক লিংক : Shariful Hasan 

 

পাঠকের মন্তব্য