“প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি” 

“প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি” 

“প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি” 

মোঃ আতাউল গনি ওসমানী : শিক্ষাক্রম শিক্ষার দর্পন। এটি শিক্ষার পরিকল্পনা। একটা দেশের উন্নতি, অগ্রগতি, আধুনিকায়ন, যুগোপযোগী হওয়া না হওয়া মূলত নির্ভর করে শিক্ষাক্রমের উপর। “শিক্ষাকেন্দ্রিক সর্ববিধ পরিকল্পনার নাম শিক্ষাক্রম।” শিক্ষাক্রমেও শিক্ষার ধরণ, প্রকৃতি, এর প্রশাসন, ম্যানেজমেন্ট, শিক্ষক, শিক্ষার্থী মান, ভৌত অবকাঠামো ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকে।

শিক্ষানীতি-২০১০ এর রূপরেখার ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর নির্দেশনা অনুসারে শিশুর নিরাপত্তা বিষয়টি পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে সংযোজন করা হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ২২টি থেকে ১৩টি ও প্রান্তিক যোগ্যতাগুলো ৫০টি থেকে ২৯টিতে পুন:নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রচলিত শিক্ষাক্রমে শিখনফল ও পরিকল্পিত কাজ ছিল না। বর্তমান শিক্ষাক্রমে শিখনফল ও শ্রেণিভিত্তিক পরিকল্পিত কাজ সম্পূর্ণ নতুনভাবে লেখা হয়েছে। প্রায় সকল শিখনফলের বিপরীতে পরিকল্পিত কাজ এবং বিজ্ঞান বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরিক্ষণ/প্রদর্শন নতুনভাবে সংযোজন করা হয়েছে। প্রচলিত শিক্ষাক্রমে পরিকল্পিত কাজ ছিল শিক্ষকের কাজ হিসেবে, পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে তা শিক্ষার্থীর অনুশীলন কাজ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০, জাতীয় শিশু নীতি, শিশু শ্রম নীতি, সবার জন্য শিক্ষা, সহস্রাব্দ লক্ষ্য-মাত্রা অর্জন, ভিশন-২০২১ সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে ভাষা শিক্ষণ-বিজ্ঞানের আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রণয়ন করা হয়েছে যা প্রচলিত শিক্ষাক্রমে নেই। গণিতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চিত্র ও তথ্যকে গাণিতিক রাশিতে প্রকাশ করার বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংযোজন করা হয়েছে।

সুকোমল মনের অধিকারী শিশুমনে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি ভালোবাসার উন্মেষ ঘটানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তাদের সামনে জাতীয় ইতিহাস, জাতির পিতার জীবনী, অন্যান্য মনিষীদের জীবনী, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির (ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাদের সংস্কৃতিসহ) সাথে ধারাবাহিকভাবে পরিচিত করানো হয়েছে। যুগের চাহিদা ও বাস্তবতার সাথে নতুন কিছু বিষয় যেমন বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও দুর্যোগকে শিশু যাতে মোকাবেলা করতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানব কর্মকান্ডের কারণে নানা প্রতিকূলতা ও দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে যার নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের উপরও পড়ছে। শিশু যাতে এসব প্রতিকূলতা ও দূর্যোগের কাছে নিজেকে নাজুক না মনে করে বরং এগুলো মোকাবেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে সক্ষম হয় সে বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।

সমাজে সকল নারী-পুরুষ, পেশাজীবী, ধনী-দরিদ্র, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুসহ সকলকে সমানভাবে গ্রহণ করা ও সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মানসিকতা তৈরি করার জন্যে কিছু নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে বিভিন্ন বিষয়বস্তু যাতে সহজবোধ্য হয় এবং শিশু সেগুলো আনন্দের সাথে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, মুখস্ত করতে না হয় সেসকল দিকে লক্ষ্য রেখে শিখন-পদ্ধতি, পরিকল্পিত কাজ এবং লেখক ও অঙ্কন-শিল্পীদের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
 
বিজ্ঞানকে যান্ত্রিকভাবে উপস্থাপন না করে বরং পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে এ বিষয়টি একটি সজীব, গতিশীল, আনন্দদায়ক ও সৃজনশীল কর্মকান্ডরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। জলবায়ুপরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যথাযথ গুরুত্ব তুলে ধরে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমকে সাজানো হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে ইংরেজি বিষয়ে filling out forms, interview, pronunciation, stress, intonation এগুলো শিশুদের মাধ্যমে অনুশীলন করার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিষয়বস্তুর বোঝা অনেকাংশেই লাঘব করা হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর নির্দেশনা অনুসারে প্রাথমিক স্তরের ধর্ম শিক্ষার সাথে (ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট) শিক্ষাক্রমে নৈতিক শিক্ষা সংযোজন করা হয়েছে। পরিবেশ পরিচিতি-সমাজ পাঠ্যপুস্তকের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়। পরিবেশ পরিচিতি-বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে প্রাথমিক বিজ্ঞান। ইসলাম শিক্ষা, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও খ্রিষ্টধর্ম পাঠ্যপুস্তকের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে রাখা হয়েছে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, বৌদ্ধধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা ও খ্রিষ্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা।

প্রাথমিক স্তরের পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমের বৈশিষ্ট্য বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রচলিত শিক্ষাক্রমে শিখনফল ও পরিকল্পিত কাজ ছিল না। বর্তমান শিক্ষাক্রমে শিখনফল ও শ্রেণিভিত্তিক পরিকল্পিত কাজ সম্পূর্ণ নতুনভাবে লেখা হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর ভাষিক দক্ষতা অর্জনের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান এবং ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীর ভাষিক দক্ষতা অর্জনের জন্য শিখনফলসমূহ সুনির্দিষ্ট ও সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রান্তিক যোগ্যতাগুলো পুনর্নিধারিত ও নতুনভাবে বিন্যাস্ত বিস্তৃত শিক্ষাক্রম কর্ম-কেন্দ্রিক (অপঃরারঃু নধংবফ) পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে শিক্ষানীতি ২০১০ এর রূপরেখা প্রতিফলিত একুশ শতকের বাস্তবতাকে ধারণ করা হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাভাষা শেখা যেন আনন্দদায়ক ও উপযোগী হয় এমন করে তা উপস্থাপন করা হয়েছে শিখন ফলের সাথে যথাযথ সংগতি রেখে ভাববস্তু ও বিষয়বস্তু সন্নিবেশ করা হয়েছে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে বাংলা বর্ণমালার ক্রম অক্ষুন্ন রেখে বাক্যানুক্রমিক পদ্ধতিতে শব্দ ও বাক্যের মিশ্র পদ্ধতি যেন অনুসরণ করা হয়, সে বিষয়ে লেখক নির্দেশনায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম ভাষা শিক্ষণ-বিজ্ঞানের আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রণীত শিখনফল নতুনভাবে সংযোজিত হওয়ায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, পাঠদান ও মূল্যায়ন সুসংবদ্ধ হলে বিষয়বস্তুর বোঝা অনেকাংশে লাঘব করা হয়েছে। লেখক ও অঙ্কনশিল্পীদের জন্য নির্দেশনা সুস্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে। কিন্তু এ সব কিছু বাস্তবায়নে মাঠ পযায়ের সমস্যাগুলোর প্রতি নজর দেয়া দরকার।

লেখক : মোঃ আতাউল গনি ওসমানী, 
সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার
সদর, নীলফামারী।

 

 

পাঠকের মন্তব্য