সিলেটের বিশ্বনাথে দক্ষিণ মিরেরচরে 'কৃষক' নির্যাতনের শিকার 

সিলেটের বিশ্বনাথে দক্ষিণ মিরেরচরে 'কৃষক' নির্যাতনের শিকার 

সিলেটের বিশ্বনাথে দক্ষিণ মিরেরচরে 'কৃষক' নির্যাতনের শিকার 

বিশ্বনাথের পল্লীতে খালে সেচের পানি আসা যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতার বিরোধে জড়িয়ে থানার দক্ষিণ মিরেরচর গ্রামের রাসেল মিয়ার মৃত নানা আব্দুল ওয়াহিদের পক্ষে আদালতে দেওয়ানী মামলা চালাচ্ছেন ৪/৫টি গ্রামের মানুষের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে কয়েকটি মৌজার মানুষ সেচ সুবিধা পেতে রাসেল মিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ঠুকেছেন। এই বিরোধপূর্ণ অবস্থায় বহু বছর আগে থেকে দক্ষিণ মিরেরচরের কৃষক গৌছ আলী তিনির বাড়ি সংলগ্ন স্থানীয় সরিষপুরের সাথির আলীর চাচাত ভাই ইরশাদ আলী ও মন্তাজ আলীর মালিকানাধিন ১০ কেয়ার জমি বর্গাচাষ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করেন।

গৌছ আলীকে এই ১০ কেয়ার জমিতে বর্গাচাষ না করতে আপত্তি দেন পার্শ্ববর্তী বাড়ির মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে রাসেল মিয়া। রাসেলের নানা মৃত আব্দুল ওয়াহিদ বেঁচে থাকা কালে মিরেরচর গ্রামের ভিতর দিয়ে তার জমির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত প্রাকৃতিক খালের পানি আসা যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়ায় আশপাশের ৪/৫টি মৌজা চান্দিরকাপন, মুফতিরগাঁও, চৌধুরীগাঁও, গোয়ালগাঁও ও সরিষপুর গ্রামের কৃষক সম্প্রদায় সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

এরপর মিরেরচরের রাসেল মিয়ার নানা মৃত আব্দুল ওয়াহিদের এই অন্যায় অমানবিক ঘটনার বিরুদ্ধে গ্রামগুলোর মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে একত্রে মিলে সেচ সুবিধা পেতে আদালতে দেওয়ানী মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন আছে। মামলা চলার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই সব মৌজার মানুষ সেচ সুবিধার পক্ষে রায় পান। পরবর্তীতে রাসেল মিয়া অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় দেওয়ানী মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।

এরই সূত্রে রাসেল মিয়া অন্যায় ভাবে গৌছ আলীকে সেই ১০ কেয়ার জমিতে বর্গাচাষ না করতে নানা ধরনের হুমকী দিয়ে গৌছ আলী ও তার পরিবারের ক্ষতি সাধন করতে থাকেন। ওই জমিটুকু বর্গাচাষ না করলে কৃষক গৌছ আলীর জীবন জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ হিসেবে রাসেলের পক্ষ সেইসব মৌজাবাসীর বিরুদ্ধে মামলা চালাচ্ছেন। সেহেতু তাদের মালিকানাধিন জমিতে কৃষক গৌছ আলী আর বর্গাচাষ করতে পারবেন না বলে ঘোর আপত্তি ছিল।

গৌছ আলীর ৮ মেয়ের মধ্যে ৭ মেয়েকে বিবাহ দিয়েছেন। তার কোন ছেলে সন্তান নেই। সেজন্য প্রতিবেশি রাসেল মিয়া, রাব্বি, ইকরাম সহ ৭/৮ জন যুবক সংগঠিত হয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গৌছ আলী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খল আচরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ সম্পদের ক্ষতি করতে থাকে। রাসেল মিয়া দক্ষিণ মিরের চরের একজন সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজ হিসেবে এলাকার যুবক ও মুরব্বীদের কাছে চিহ্নিত, তেমনি আতঙ্ক। তার ভয়ে এলাকার বহু মানুষ সাহস করে বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা বলতে পারে না।

রাসেল মিয়ার উচ্ছৃঙ্খল কাজে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি সহ গ্রামের নগণ্য সংখ্যক মানুষ সমর্থন যোগাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহ প্রশাসনের কাছে রাসেল মিয়ার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়া হলে ওই জনপ্রতিনিধির দাপটের কারণে থানা পুলিশ ব্যবস্থা নিতে না পেরে পাল্টা কৃষক গৌছ আলীর বিরুদ্ধে যাচ্ছে তাই অভিযোগ দেয়া হয়। যার দরুণ আসল অপরাধী রাসেলের দোষ আড়াল করে গৌছ আলীকে দোষারূপ করে প্রশাসনকে বিগড়ে ভুল পথে পরিচালনা করা হয়। রাসেলের অপরাধ আড়ালের সমর্থক জনপ্রনিধি বিশ্বনাথ থানা আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী এক সদস্য বলে জানা গেছে।

গত ১১ এপ্রিল রোববার সরেজমিনে দক্ষিণ মিরেরচর গ্রামে পৌছে রাসেল ও গৌছ আলীর পক্ষ সহ গ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট মুরব্বীদের সাথে আলোচনা করলে এসব তথ্য বের হয়ে আসে।

মুরব্বীদের সাথে আলোচনা কালে দক্ষিণ মিরের চরের নূর ইসলামের ছেলে আশিক আলী, গেদাব আলীর ছেলে শামীম, মৃত সিকন্দর আলীর ছেলে চমক আলী, মৃত আব্দুল করিমের ছেলে জমির উদ্দিন, চমক আলীর ছেলে মারুফ আলী, মানিক মিয়ার ছেলে আনসার মিয়া, মৃত রুস্তম আলীর ছেলে সিতাব আলী, মৃত আরশদ আলীর ছেলে মাহমুদ আলী প্রমুখ ১৫ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

বিশিষ্ট মুরব্বীদের উপস্থিতিতে ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের সমস্যার আসল চিত্র বের হয়ে আসে। মুরব্বীরা বলেন, কৃষক গৌছ আলী সহজ সরল মানুষ। তিনি গ্রামবাসীর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলেন। কখনও তিনি এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করেননি।

প্রশাসনে দেয়া গৌছ আলীর যে সব অভিযোগ ও স্মারকলিপিতে গ্রামবাসীর যেসব ব্যক্তির স্বাক্ষর দেয়া হয়েছে তা সত্য। এই সাক্ষরসমূহ বহন করে গৌছ আলীকে এলাকায় কেমন ভাল পায় মানুষ তারই প্রমাণ।

এই প্রতিবেদক দুপুরে রাসেল মিয়ার বাড়ির প্রবেশ পথে পৌছিলে তার বড় ভাই লাল মিয়ার সাথে সাক্ষাৎ হয়। লাল মিয়া গৌছ আলীর দেয়া সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং রাসেল কোথায় জানতে চাইলে বলেন, সে সিলেট চলে গেছে। অথচ রাসেল বাড়ির ভেতরেই ছিল।

এ সময় গৌছ আলীর স্ত্রী রোকিয়া বেগমকে দেখতে পেয়ে লাল মিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ওই শয়তানকে কে সঙ্গে আনছে। বেলা আনুমানিক ২টায় স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার রফিক এ প্রতিবেদকের ফোনে কল দিয়ে কথা বলেন, তিনি সেখানে উপস্থিত থাকতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন। রফিক মেম্বারের কাছে আসল বিরোধ জানতে চাইলে মেম্বার জানান, উল্লেখিত গ্রামগুলোর মানুষের সাথে খালের সেচের পানি নিয়ে মামলা মোকাদ্দমার বিরোধ রয়েছে। তাদের মালিকানাধিন ১০ কেয়ার জমি কৃষক গৌছ আলীর বাড়ি সংলগ্ন হওয়ায় গৌছ আলী ওই জমি বর্গাচাষ করে যাচ্ছেন। গৌছ আলীকে মিরেরচরের রাসেল মিয়ার পক্ষ নিষেধ করে ছিলেন ওই জমি চাষ না করার জন্য। কারণ রফিক মেম্বার বলেন, ওই গ্রামগুলোর সাথে দক্ষিণ মিরেরচরবাসীর যোগাযোগ নেই। এ বিষয়ের জের ধরে রাসেল মিয়ার পক্ষ সমর্থক গৌছ আলীর বিরুদ্ধে ক্ষতি করতে লেগেছেন।

প্রায় দু'মাস আগে রাসেল মিয়া জোর করে গৌছ আলীর বাড়ির পালিত ৪টি হাঁস ধরে নিয়ে যায়। হাঁসগুলো তিনি ফেরত দেয়নি। এ নিয়ে স্থানীয় ইন্তাজ আলীর পুত্র ফয়জুর রহমানের বাড়িতে সালিশ বৈঠক হয়। বৈঠকে দক্ষিণ মিরেরচরের কালাম মিয়া, নোয়াগাঁওয়ের নুর মিয়া, ওসমানীনগরের ইসরাইল আলী মাষ্টার ও জহুর আলী মাষ্টার প্রমুখ রাসেলের পক্ষ হয়ে লড়ে রাসেলকে নির্দোষ বানাতে পারেননি। ওই বৈঠকে রাসেল দোষী সাব্যস্ত হন। বৈঠকে গৌছ আলীর পক্ষে উত্তর মিরেরচরের সাহাব উদ্দিন, মশাহিদ আলী, সাদিক আলী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পরে রাসেল বৈঠক শেষে বিচার মেনে পরবর্তীতে তিনি সালিশ বৈঠকের নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করেন। ওই জেরে গৌছ আলীর গোয়াল ঘরের ৩টি গরু রাতের আধারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

রাসেল মিয়া গৌছ আলীর দুসম্পর্কে ভাতিজা হন। উভয়ের বাড়ি পাশাপাশি। বিরোধপূর্ণ খালটি দক্ষিণ মিরেরচর থেকে ৫/৬টি মৌজায় গিয়ে পৌছেছে। সেজন্য সেচ সুবিধা সবাই এর অধিকার পায়। এরই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন রাসেল মিয়ার নানা আব্দুল ওয়াহিদ।

পাঠকের মন্তব্য