লিওপোল্ড ওয়েস থেকে মুহাম্মদ আসাদ

লিওপোল্ড ওয়েস থেকে মুহাম্মদ আসাদ

লিওপোল্ড ওয়েস থেকে মুহাম্মদ আসাদ

প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ : মুহাম্মদ আসাদ যার আসল নাম লিউপোল্ড উয়িস, জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ২ জুলাই ১৯০০ সালে আস্ট্রিয়া-হাঙ্গিরী সম্রাজ্যে (বর্তমানে ইউক্রেনের লিভ শহরে) এবং মারা যান ২০ ফেব্রয়ারি ১৯৯২ সালে স্পেনে এবং সেখানেই এক মুসলিম কবরস্থানে শুইয়ে আছেন। তিনি অস্টো-হাঙ্গেরিয়ান একজন ইহুদি মধ্যপ্রাচ্যে ও ইরানের কিছু অংশ ভ্রমণ করে জীবনের বাস্তবতা ও ইসলামি বিশ্বাস ও সভ্যতার সাথে পরিচিত হন। 

সাংবাদিক হওয়ার জন্য পিএইচ. ডি বাদ দিয়ে পরিবারের অমতে প্যারিসে চলে আসেন। ছোটকাল হতে 'ওল্ড টেষ্টামেন্ট ও তাল্মুদের' জ্ঞান ভালোভাবে আয়ত্ব করেন। ১৩ বছর বয়সে নিজস্ব জার্মান ও পোলিশ ভাষার পাশাপাশি, তিনি হিব্রু ও আরামিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন পরে আরো মধ্য বিশের দিকে শিখেন ফ্রেন্স ও ইংরেজি। দাদা চেয়েছিলে তাকে ইহুদি রাব্বি তৈরি করতে। কিন্ত তিনি জার্মান সংবাদপত্র 'ফ্রাংফুইতা জাইতাং' এর একজন নাম করা সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠেন যা তাঁর একরোখা দৃঢ় সংকল্পের পরিণতি। মুসলমান হবার কাহিনীও তাঁর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর ছিল। আসলে কোরআন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অন্যান্য ইউরোপিয়ানদের মতোই ছিল। তিনিও মনে করতেন এটি আসলে মুহাম্মদ নামের এক মানবের মনের ফসল। কিন্তু তাঁর ভুল ভাঙ্গে সাধারণ বিদুইন-আরবদের সাথে মিলামেশা করে; তাদের আতিথিয়তা ও সহজ সরল জীবনের প্রজ্ঞার প্রকাশ দেখে। 

তিনি ১৯২৬ আস্ট্রিয়া ফিরে দেখেন -আসন্ন এক মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষের যন্ত্রণার পর সাধারণ মানুষেরা বেশ সম্পদের প্রাচুর্যের মধ্যে অবগাহন করছেন; কিন্তু তাদের পরণের সুন্দর পোশাকের আড়ালে সুখের বা আনন্দের কোনো অনুভূতি নেই যেন তারা জলন্ত দোজখে বাস করছেন। তাঁর স্ত্রী একজন চিত্র শিল্পী; তিনিও তার কথায় সায় দিলেন। তখন তিনি বাসায় গিয়ে আনমনে কোরআন উল্টিয়ে পড়তে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে সুরা 'তাকাছুর' পড়েন আর সেখানেই পান বর্তমান অবস্থার নিখুঁত বিবরণ। 
 
সেখানে লেখা "বেশি সুখ সম্পদে লাভের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে আমৃত্যু মোহাচ্ছন্ন করে রাখে... নিশ্চিত জ্ঞান থাকলে তোমরা কখনই মোহাচ্ছন্ন হতে না। তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে..." । তখন তিনি ভাবলেন আমি তো জাহান্নাম চোখের সামনেই দেখছি। তারপর তিনি ভাবলেন ১৩ শত বছর আগে একজন উম্মী নবি কিভাবে এই কথা বলে যেতে পারেন যার বাস্তবতা বর্তমানে সবার মধ্যে দেখছি। আসলেই তো, কোরআন আল্লাহর বাণী এতে কোন সন্দেহ নেই। পরের দশকে তিনি বিংশ শতাব্দীতে একজন নাম করা মুসলিমে পরিণত হন। তিনি ধর্মীয় ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ের পক্ষপাতি ছিলেন যেমন- তিনি দাজ্জালকে ব্যক্তি হিসেবে না দেখে আধুনিক যুগের আধ্যাত্মিকতাহীন বস্তুবাদের আভিশপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। 

কোরআনের অনুবাদ 'ম্যাসেস অব দ্যা কোরআন' যা তাঁর ১৭ বছরের গবেষণার সেরা গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত" এবং যা আধুনিক যুগে প্রভাব বিস্তারকারী এক অসাধারণ ইংরেজি অনুবাদ। এ-ই বইটির দ্বারা তিনি জীবনের গভীর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের কাছে ব্যাখ্যা ও অনুবাদসহ কোরআনকে তুলে ধরেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা 'রোড টু মক্কা এবং 'হোম কামিং অব দ্যা হার্ট'। অন্যদিকে রাজনীতির উপর তাঁর লিখিত বই 'প্রিন্সিপাল অব স্টেট অ্যান্ড গর্ভমেন্ট ইন ইসলাম'। আসাদকে ইসলামের জন্য ইউরোপীয় দান হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং তিনি পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে একজন শান্তিস্থাপক হিসেবেই আমৃত্যু
কাজ করেন।    
   
-লেখক : প্রভাষক ইংরেজি বিভাগ, কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট স্যাপার কলেজ। 

পাঠকের মন্তব্য