প্রসঙ্গ মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবির 

প্রসঙ্গ মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবির 

প্রসঙ্গ মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবির 

দুলক আহমেদ : অনেকদিন যাবত দেখছি শাহরিয়ার কবিরকে বিভিন্ন মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেয়া হচ্ছে। তিনি ৭১ সালে সাড়ে ২০ বছর বয়সী ঢাকা শাহরিয়ার কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। শোনা যায় তিনি ৭১ সালে নিয়মিত ক্লাস করেছেন এবং পরীক্ষাও দিয়েছেন। আবার এও শোনা যায় তিনি কিছুদিন ভারতে অবস্থান করেছিলেন। এ দুটি বিষয়ে আমার কাছে কোন রেফারেন্স নেই। লেখক মহিউদ্দিন তার বেলা অবেলা বইয়ে এদের কাউকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন ভারতে গেলেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়না বা বাংলাদেশে অবস্থান করলেই রাজাকার হয়না। 

তিনি  ৭২ সালে  “পুবের যাত্রী” নামে একটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস লিখেছিলেন। পুবের সূর্য উপন্যাস এ তিনি সময় কাল দেখিয়েছেন ২৫ মার্চ থেকে পুরা এপ্রিল মাস পর্যন্ত। উপন্যাসে তিনি জিয়াকে একই নামে একটি চরিত্র দেখিয়েছেন। উপন্যাসে বাকী সেনা কর্মকর্তাদের চরিত্র কাল্পনিক। উপন্যাস কখনও সত্যি ইতিহাস নয় তবুও উপন্যাসের প্রভাব মানব জীবনে অনেক প্রভাব ফেলে। উপন্যাসে তিনি আওয়ামী লীগের সাথে ন্যাপ সমান্তরাল আন্দোলন করেছেন তা বুঝিয়েছেন। শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা না করে আপোষ করতে চান তা বুঝাতে চেয়েছেন। উপন্যাসের সময়কাল এক মাস হলেও শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন তা কোন চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেননি। তিনি জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণাকে তুলে ধরেছেন এবং যুদ্ধ নায়ক হিসেবে উপস্থিত করেছেন।

শাহরিয়ার কবির ৭২ সালে যোগ দেন বিচিত্রার সহকারী সম্পাদক হিসেবে। পত্রিকাটি ছিল চৈনিক বামের এক আড্ডাখানা।

চৈনিক উগ্র বাম ঘরানার শাহরিয়ার কবির ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের প্রতি  দীর্ঘদিন নমনীয়  ছিলেন না। ছিলেন না মুজিব ভক্ত। আওয়ামী লীগের দুর্দিনে তার লেখার কোথাও তিনি বঙ্গবন্ধু লিখেননি। 

৭৪ সালে শাহরিয়ার কবির  বিচিত্রায় “ওদের জানিয়ে দাও” নামে একটি উপন্যাস লিখেন যাতে আওয়ামী লীগকে রুক্ষ ভাবে কটাক্ষ করেন। চরিত্র গুলোতে মুজিব কোটধারী নেতা, চোরাচালান, দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু, দাফন নিয়ে আওয়ামী বিদ্বেষী মনোভাব তুলে ধরেন। গত ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে চ্যানেল আই এর এক টক শো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির এহসানুল হক মিলন, এইচটি ইমাম এবং শাহরিয়ার কবির। টক শোতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এহসানুল হক মিলন তার বক্তব্য এ এইচটি ইমামের বই ও ৭১ এ তার ভুমিকা নিয়ে খুব প্রশংসা করে যাচ্ছিলেন। তার প্রশংসায় গদগদ  হয়ে এইচটি ইমাম  সে শোতে প্রায় সময়েই নিশ্চুপ ছিলেন। মিলন এক পর্যায়ে শাহরিয়ার কবিরের ওদের জানিয়ে দাও উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত রূপ প্রকাশ করেন। রাগে গদগদ হয়ে শাহরিয়ার কবির তার সে উপন্যাসের প্রসঙ্গ থেকে সরিয়ে এনে মিলন কে চোর দুর্নীতিবাজ বলে চীৎকার করে স্টুডিও কম্পমান করে তুলেন।      

৭৫ সালে বাকশাল গঠন কালে সাংবাদিক সমিতি দু ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক কবি শামসুর রহমান বাকশালে যোগ দেয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি  বিভিন্ন ভাবে তা সাংবাদিকদের প্রকাশ করতেন। শাহরিয়ার কবির তার কথায় অনুপ্রানিত হয়েছিলেন। সাংবাদিকদের বিশাল অংশ বাকশালে যোগ দেন। ক্ষুদ্র একটি অংশ বাকশাল বিরোধী গ্রুপ রুপে কাজ করতে থাকে। শাহরিয়ার কবির বাকশাল বিরোধী গ্রুপে সক্রিয় ছিলেন। তাদের সাথে আরও ছিলেন আনোয়ার জাহিদ, এনায়েত উল্লাহ খান, মাফুজুল্লাহ, রিয়াজউদ্দিন, রুহুল আমিন গাজী। ছাত্রজীবন থেকেই শাহরিয়ার কবির কট্টর মাওবাদী ছিলেন। ভাসানী ছিল তার আদর্শ নেতা। মাও এবং ভাসানীকে নিয়ে তিনি ২ টি বই লিখেছেন। অবশ্য তাদের দলে শাহরিয়ার কবির সংগ্রামের রুহুল আমিন গাজীর অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি দাবী করেন বিচিত্রায় থাকাকালীন বিচিত্রা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের কর্মকাণ্ড পত্রিকায় ব্যাপক ভাবে তুলে  ধরেছিল।   

তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “ডানা প্রকাশনী” থেকে প্রকাশ  হয়েছে মুজিব বিরোধী এবং শেখ কামালের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারী কিছু বই যে বই এর রেফারেন্স এখনও প্রতিপক্ষরা ব্যাবহার করে থাকে। এর মধ্যে আছে বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের একটি বই যেখানে শেখ কামালকে গুন্ডা উল্লেখ করা হয়েছে। তার রাজনৈতিক লেখালেখিতে শেখ মুজিবের নাম আসলে সাধারণ ভাবেই তিনি তা লিখতেন। 

এরশাদের আমলে তিনি পাকিস্তান দুতাবাসের এক অনুষ্ঠানে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দাওয়াতে যান এবং সেখানে উপস্থিত সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক কামরুজ্জামানের ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন।   

তিনি জহির রায়হানের অন্তর্ধান নিয়ে একটি তত্ত্ব প্রচার করেন যাতে ইঙ্গিত দেয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধে তাদের অপকর্ম ঢাকতে তাকে গুম করেছে। বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়ও তিনি একই কথা প্রকাশ করেছেন। তার তত্ত্ব অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা জহির রায়হানের বোন নাফিসা কবিরের সাথে শেখ মুজিবের কথোপকথনের একটি বাক্য ব্যাবহার করতো।  

৯২ সালে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে যোগদান করে তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হন এবং ৯৬ সাল থেকে আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে গণ্য হতে থাকেন যা এখনও অব্যাহত আছে। এ সময় জামাত বিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অবদান রাখেন। জামাত রাজাকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে অবশ্য স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া যায়।  

মুস্তারি শফি তার লেখায় শাহরিয়ার কবিরকে মুরগী সাপ্লায়ার উল্লেখ করলেও প্রকৃত পক্ষে শাহরিয়ার কবির পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুরগী সাপ্লায়ার ছিলেন এমন প্রমান মিলে না। হয়তো মুস্তারি শফির কাছে এ ধারনা আসে যে শাহরিয়ার কবির চৈনিক বাম এবং আনোয়ার জাহিদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনা এ অভিযোগ তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ সালে সংগ্রাম পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে অস্বীকার করেন।

১৬ ডিসেম্বরের পর অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা বনে যায়। তাদের ষোড়শ ডিভিশন মুক্তিযোদ্ধা বলে। মুক্তিযোদ্ধা প্রমান না থাকলে শাহরিয়ার কবিরও এ দলের। তা না হলে তিনি কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন ? কোথায় যুদ্ধ করেছেন ? তার কমান্ডার কে ছিল তা প্রকাশ হোক।  

নোট : শাহরিয়ার কবিরের নিজস্ব লেখা ও সাক্ষাৎকার সাপ্তাহিক রাঙ্গা মেঘ সাতরে যায় সংখ্যা ১৮ বর্ষ ৭ তারিখ ২ অক্টোবর ২০১৪, পীর হাবিবুর রহমানের লেখার অংশ, তার দুটি উপন্যাসের অংশম কিছু রেফারেন্স হারিয়ে গেছে।

 

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : Dulok Ahmed

পাঠকের মন্তব্য