করোনাভাইরাস একটি সুচিন্তিত “জীবাণু যুদ্ধ” 

মোঃ গোলাম সারোয়ার, কলামিস্ট ও গবেষক 

মোঃ গোলাম সারোয়ার, কলামিস্ট ও গবেষক 

মোঃ গোলাম সারোয়ার : করোনার কারণে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিদেশিদের হজে যাওয়া বন্ধ করার কথা ভাবছে সৌদি আরব। 

স্মরণ করুন, করোনা বায়ো-ওয়ার শুরু করার আগে চীন ঘোষণা দিয়েছিলো, তারা তাদের মতো করে কোরআন ও বাইবেল লিখবে। মানে তাদের বস্তুবাদী কমিউনিস্ট বিশ্বাস মাথায় রেখেই বিশ্বকে ধর্মপালন করতে হবে। চীন মূলত 'নিউ ওয়াল্ড অর্ডার' বাস্তবায়ন করতে সভ্যতার সংঘাত মাথায় রেখে তিনটি দুর্গে আঘাত হানে। এগুলো হলো; ধর্ম বিশ্বাস, বাণিজ্য প্রতিযোগিতা এবং সামরিক আগ্রাসন। 

ধর্ম বিশ্বাস বলতে, তারা আঘাত হানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষের ধর্ম খ্রিস্টান, ইসলাম এবং হিন্দু ধর্মকে। এর ভিতরে কমিউনিজমের সবচেয়ে বড় থ্রেট ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের প্রধান মারকাজগুলো হয়েছে তাদের প্রধান টার্গেট। সেগুলো প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেগুলো হলো; ভ্যাটিকান, মক্কা ও মদিনা। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম ধর্মকে নেতৃত্ব দেয়ার আরো দুটি শক্তি ইরান ও তুরস্ক বাণিজ্যিক ও সামরিকভাবে তাদের মতাদর্শের সাথে বৈরীপূর্ণ না হলেও ধর্মের বিবেচনায় তারা ইরান ও তুরস্কে আঘাতটি জারি রাখে। 

বাণিজ্যিক বিচারে বিশ্বে চীনের প্রধান শত্রু ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো ও ব্রাজিল। ভারতের কথা পরে আবারো আসছি। দক্ষিন আমেরিকাতে ব্রাজিল ছাড়া করোনায় তেমন কেউ বিপদে নেই। আছে কেবল ব্রাজিল। ব্রাজিল সীমান্তের ভেনেজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, বলিভিয়া, পেরু, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে,--কারো তেমন কোন সমস্যা নেই। সমস্যা শুধু চীনের চক্ষুশূল ঐ এক ব্রাজিলের। আফ্রিকাতে ৫৪টি দেশ থাকলেও সবচেয়ে বিপদে আছে সাউথ আফ্রিকা।

সামরিক বিচারে চীনের প্রধান শত্রু ইউরোপ-আমেরিকার সামরিক জোট ন্যাটো এবং এই অঞ্চলে ভারত। ইউরোপের স্বাধীন দেশ হলো ৪৬টি। সবগুলো দেশ প্রায় কাছাকাছি হলেও সমস্যা শুধু সেই কয়েকটি রাষ্ট্রের যারা ন্যাটোতে নেতৃত্ব দেন। এর ভিতরে বিপদে আছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও স্পেন ইত্যাদি কয়েকটি রাষ্ট্র। ৪৬টি রাষ্ট্রের বাকীগুলো মোটামুটি নিরাপদ।

উত্তর আমেরিকাতে দেশ আছে ২৩টি। কিন্তু বিপদে আছে ন্যাটোর নেতা এবং চীনের প্রধান শত্রু যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া সেখানে আর বিপদে আছে বাণিজ্যিক শত্রু হিসেবে মেক্সিকো। এছাড়া বাকী একুশটি দেশ মোটামুটি নিরাপদ অবস্থাতে আছে। অন্যদিকে ১৪০ কোটি মানুষের যে দেশ চীনে এটার উৎপত্তি সেখানে এত সহজে তা নির্মূল হয়ে গেল! 

মুসলিম এবং খ্রিস্টান দেশগুলোর ভিতরে মোটামুটি বিপদে আছে সেগুলো যেগুলো ধর্ম নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে। মানে তাদের বিশ্বাস করানো হচ্ছে, বস্তু ও ঘটনা কার্যকারণে চলে, আল্লাহ খোদা ভগবান গড দুনিয়া চালায়না। এছাড়া এশিয়াতে চীনের প্রধান এবং একমাত্র শত্রু হলো ভারত। সেটা ধর্মের বিবেচনায় যতটা তারচেয়ে ঢ়ের বেশি সীমান্ত নিয়ে। মানে সিকিম, অরুণাচল, আকসাই কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়েই চীন-ভারতের সংঘাতা। চীন এবং ভারত ভালো করেই জানে তাদের মাঝে একটি যুদ্ধ অনিবার্য। সেটা তারা উভয়ে মাথায় রাখে। 

এশিয়া ইউরোপের আরেক শক্তি রাশিয়া রাজনৈতিক দর্শন বিবেচনাতে চীন কাছাকাছি আবার দূরেরও। চীন চলে মাও ইজম নিয়ে আর রাশিয়া চলে মার্কস, লেলিন এ্যঙ্গেল নিয়ে। সেসব বিবেচনাতে তাদের মাঝে একটি স্নায়ু ধর কষাকষি আছে। সেটা প্রথমে বিবেচনা থাকলেও এখন তাদের মাঝে রফাদফা হয়ে গেছে। তারা আগে ইউরোপীয় শক্তির বিনাশ চায়, যারা আড়াই হাজার বছর ধরে বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। যদিও এটাও সত্য যে, ইউরোপ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নেয়ার স্বপ্ন একটি দুঃস্বপ্ন মাত্র।

এখন কথা হলো, আলোচ্য টার্গেটেড অঞ্চলগুলো ছাড়া করোনায় বাকী বিশ্বের কি কোন টেনশন বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি ? হয়েছে কিছুটা। এটা ঠিক এরকম, দুটো বুনো ষাড় যখন মল্লযুদ্ধে নামে তখন আশেপাশের বাড়িঘর, শিশু বৃদ্ধ, ফসলের কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়। সে রকম কিছুটা ক্ষতিতে আমরাও আছি। কিন্তু মোটা দাগে করোনাকে চূড়ান্ত উপেক্ষা করার পরেও পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ হয়েও আমরা তেমন ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হইনি এখনো। যেটুকু হয়েছি তার কারণও ধার্মিক ও রাজনৈতিক, যেটুকু হইনি তাও ধার্মিক ও রাজনৈতিক। 

শেষ কথা হলো; ২২টি প্রদেশ, পাঁচটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল, চারটি কেন্দ্রশাসিত পৌরসভা, দুইটি প্রায়-স্বায়ত্বশাসিত বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং ও মাকাউ এবং একটি বিদ্রোহী রাষ্ট্র তাইওয়ান নিয়ে চীন নিজেকেই একটি বিশ্ব মনে করে। 

তারা বহু বছর ধরে বিশ্বাস করে আসছে, পৃথিবীর নেতৃত্ব দেয়ার একমাত্র দাবিদার চৈনিক সভ্যতা। সে বিশ্বাসের পথ ধরেই তারা কাজ করছে যুগের পর যুগ এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী। সেই লক্ষ্যেই পশ্চিমা বিশ্ব যখন যন্ত্র নিয়ে গবেষণায় পড়ে রইলো, চীন তখন গত একশ বছর ধরে সময়, মেধা ও অর্থ বিনিয়োগ করলো অনুজীবে। যার প্রকাশ পৃথিবীর এই 'নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার।'

এখন এই সংকটে আমাদের মুক্তির পথ কি ? পথ একটাই তা হলো চাইনিজ টিকা। এছাড়া পৃথিবীর কোন বটিকাতেই করোনা থেকে মুক্তি নেই। ইউরোপ যত টিকাই বানাক এটি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ইত্যাদি ফরম্যাটে আসতেই থাকবে। আর একটি কথা। চীন ভারতের টেনশনে বাংলাদেশ কিন্তু একটি স্পর্শকাতর ভূমি। চীন তাদের দাবিকৃত ভারতের আরুণাচল আক্রমণ করলে ভারতের সেখানে দ্রুত পৌঁছাতে হলে হয় নেপাল কিংবা বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে হবে। চীন নেপালকে ভারতের পকেট থেকে বের করে নিয়ে গেছে। ইন্ডিয়ার হাতে আর একমাত্র বিকল্প হলো বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ভারতের সামরিক রশদ পরিবহনে নিজেদের ভূমি ব্যবহার করতে দিলে চীন মিয়ারমারকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এ্যকশনের সূচনা করবে। আর যদি ভারতকে ব্যবহার করতে না দেয় তবে স্বয়ং ভারত বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনে অঘটন ঘটাবে। এটি হলো নিকট ভবিষ্যতের নিক্তি। এই নিক্তিতে ভুল করলে সামরিক সংকটের সাথে সাথে করোনার সংকটও নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। 

এই সত্য বাংলাদেশ জানেন। এটি মাথায় রেখেই বাংলাদেশকে রাষ্ট্রের ভিতরের এবং বাইরের সংকট 'ডে ওয়াইজ' মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পারছে বলেই চীন ও ভারতের শীর্ষ নেতারা বারংবার ঢাকা সফর করছে। আশা করি এই গেইম থিউরিতে বাংলাদেশ টিকে যাবে।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক 

পাঠকের মন্তব্য