ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যা মহা ঐতিহাসিক; সহজ সমাধান নেই

মোঃ গোলাম সারোয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক

মোঃ গোলাম সারোয়ার; কলামিস্ট ও গবেষক

মোঃ গোলাম সারোয়ার : ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট সমাধানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক বসেছে। তবে আশা করি, বরাবরের মতো এবারো সমস্যা সমাধানের কিছুই হবেনা। 
 
কারণ ইসরায়েল ফিলিস্তিন সমস্যা একটি মহা ঐতিহাসিক সমস্যা। এই সমস্যা সৃষ্টিতে জগতের অনেক বড় বড় মানুষ জড়িত।

ফিলিস্তিনে প্রথম বহিরাগত হিসেবে ইরাক থেকে এসে প্রবেশ করেন ইহুদি ও মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। তারপর তাঁর সন্তানরা দাবি করেন, এই ভূমিকে খোদা তাঁদের দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারপর হযরত ইসহাক থেকে শুরু করে তাঁর সন্তান ইয়াকুব নবী পর্যন্ত তাঁরা সেখানে ছিলেন।

ইয়াকুব নবীর পুত্র ইউসুফের পরিণত আমলে দুর্ভিক্ষে পড়ে ইহুদিরা মিশরে প্রবেশ করে। ইউসুফের মৃত্যুর পর মিশরীয়রা ইহুদিদের দাস করে নেন। সেখানে চারশ বছর তাঁরা দাসত্ব করেন। তারপর ইহুদি পুত্র ও ক্যারিশম্যাটিক লিডার মুসা নবীর নেতৃত্বে ইহুদিরা রেড সি পাড়ি দিয়ে মিশর থেকে বের আসেন তাঁদের প্রমিজল্যাণ্ড ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে। 

মুসা নবীর জীবদ্দশায় তাঁরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে পারেননি। তাঁর অনুসারী জসুয়ার নেতৃত্বে মূলত তাঁরা ফিলিস্তিনিদের পরাজিত ও বিতাড়িত করে ফিলিস্তিন দখলে নেয়। এর ফলে পৌত্তলিক ফিলিস্তিনিরা পরাজিত ও বিতাড়িত হয়ে ভূমধ্যসাগরের আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর ইহুদিরা সেখানে বসবাস করতে থাকে। ইব্রাহিমের নাতি ইয়াকুবের আরেক নাম ইসরায়েল। তাঁর নাম অনুসারে তাঁরা এই ভূমির নাম দেন ইসরায়েল। এভাবে ইসরায়েলের বারজন পুত্রের বারটি গোত্র এখানে বসবাস করতে থাকেন।  

পরবর্তীতে ইহুদিদের আরেক সন্তান নাসারার বেথেলহেমের অধিবাসী ইসা নবী ইহুদি ধর্মের সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর অনুসারীরা ইহুদিদের থেকে আলাদা হয়ে খ্রিস্টান ধর্মের শুরু করেন, যেহেতু ইসা নবীকে তাঁরা ডাকতেন জেসাস খ্রাইস্ট নামে। 

এভাবে ফিলিস্তিনে খ্রিস্টানদের আবির্ভাব ঘটে। আরবীয় মুসলমানদের ইসরায়েলে প্রবেশ ঘটে হযরত ওমর (রাঃ)-র আমলে, যখন ওমর ইসরায়েল দখল করেন। তিনি ইহুদিদের আরেক বড় নবী সুলাইমান (আঃ) এর নির্মিত সবচেয়ে বড় প্রার্থনা গৃহ নিজেদের করায়ত্বে নিয়ে আসেন। তিনি এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যা হলো বর্তমান আল আকসা। 

ইহুদিদের মতে, আরবদের সাথে ভৌগোলিকভাবে ফিলিস্তিন বা ইসরায়েলের দাবি কতৃর্ত্বের কোন সম্পর্ক নেই। তবে আরবদের পক্ষ থেকে কিছু ক্রমান্বিত স্টোরি আছে। ইব্রাহিমের দুই পুত্র। একজন ইসহাস এবং অন্যজন ইসমাইল। আরবরা হলো ইসমাইলের বংশধর, যাঁকে জন্মের পর তাঁর পিতা ফিলিস্তিন থেকে আরবের আরাফাত ময়দানে মাতা হাজেরার সাথে রেখে যান। 

এই পর্যন্ত মানতে কোন পক্ষের কোন সমস্যা নেই। মুসলিমদের সাথে দাউদ নবীর পুত্র সুলাইমান নবীর প্রার্থনা গৃহের সম্পর্ক হলো, মিরাজের রাতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) উর্দ্ধাকাশে গমনের পূর্বে এই প্রার্থনা গৃহে নামাজ আদায় করেন--এই ইতিহাস পর্যন্ত। 

এমনিতে পূর্বে পৃথিবীর সব একেশ্বর ধর্মের লোক এই প্রার্থনা গৃহের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতেন। এমনকি মুসলিমরাও ফিলিস্তিন তথা ইসরায়েলের এই প্রার্থনা গৃহের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতেন। পরবর্তীতে মুসলিমরা মক্কার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন প্রত্যাদেশ মতে। 

হযরত ওমরের ইসরায়েল দখলের পরে ইহুদিরা আবারো তাঁদের প্রমিজল্যাণ্ড হারান এবং বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও তাদের পিতৃভূমিকে ভুলতে পারেননি। এরপর প্রায় সাড়ে বারশ' বছর তাঁরা ইসরায়েলে প্রবেশের চেষ্টা করেন। 

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে ব্রিটেনকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতির ফলাফলে যুদ্ধের শেষের দিকে ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী রবার্ট বেলফোর ঘোষণা করেন, ইসরায়েলে ইহুদিদের জন্যে একটি দেশ হবে। তারপরও ইহুদিদের তাঁদের সেই প্রমিজল্যাণ্ড ফিরে পেতে অপেক্ষা করতে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের প্রতি হিটলারের নির্মমতার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব ইহুদিদের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠেন। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদিকে হত্যা করে। তার প্রেক্ষাপটে সেই বেলফোর ঘোষণার স্যাডোতে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদি রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যা আরবরা সহ মুসলিম বিশ্ব মনে করে, এটি একটি দখলদার রাষ্ট্র। 

ইতিহাসের সত্য পাঠ মেনে নিলে ফিলিস্তিনে সেই পৌত্তলিক ফিলিস্তিনিরাই ছিলো ভূমিপুত্র, যাঁরা কালের গর্ভে হারিয়ে যান। এছাড়া গল্পের বস্তুনিষ্ঠ বিচারে ওখানে ইহুদিরা, খ্রিস্টানরা এমনকি মুসলিমরাও দখলদার। 

এখন সত্য যেহেতু কেউ মেনে নিতে নারাজ তাই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যার নিকট ভবিষ্যতে কোন সমাধান নেই। হয় তিনটি জাতি নিজেদের মেনে নিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সেখানে বসবাস করতে হবে, অন্যথায় তিনটি জাতিকেই সেখান থেকে নির্ষ্কমণ করে সেখানে জাতিসংঘের অধীনে একটি আন্তর্জাতিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের জন্ম দিতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক 

 

পাঠকের মন্তব্য