Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ , সময়- ১০:০১ পূর্বাহ্ন
Total Visitor:
শিরোনাম

কঠিন বিভীষিকাময় দু:সহ স্মৃতি


অনলাইন রিপোর্ট

আপডেট সময়: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ৯:০১ পিএম:
কঠিন বিভীষিকাময় দু:সহ স্মৃতি

সুন্দরীর পুজারি সবাই। নিজের রূপ সৌন্দর্য নিয়ে অনেকেই মনের গভীরে তৃপ্তিদায়ক গর্ববোধ করে থাকেন। সৌন্দর্য সুরক্ষায় তরুণী, নারীদের সচেতনার অভ্যাস সেই আদিকাল থেকেই। সুন্দরীদের কদর সমাজে যেমন আছে তেমনি স্বামীর কাছে। কিন্তু রোহিঙ্গা সুন্দরীদের কাছে সুন্দরী হওয়াটা যেন এক মারাত্বক অভিশাপ। কঠিন বিভীষিকাময় দু:সহ স্মৃতি।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মুলের অভিযানের শুরু থেকে শিশু, তরুণ, তরুণী, যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে সকল বয়সীদের নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। গুলি করার পাশাপাশি কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু তাই না, অভিযানের সময় মিয়ানমার সেনা সদস্যরা সুন্দরী তরুণী, গৃহবধুদের উপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। স্বামী-সন্তান কিংবা মা-বাবার সামনে গণধর্ষন করে সেনারা। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত সুন্দরীদের উপর এই নির্যাতন চলে বিরামহীনভাবে। এর পর গলা কেটে হত্যা করে লাশ ফেলে চলে যায়। এদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি সুন্দরী তাদের সেনাবাহিনীর ডেরায় আটক রেখে চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন। এমনই এক নির্যাতনের শিকার সায়মা (ছদ্দনাম)। বয়স ২৫। বছর দু’য়েক আগে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সাথে বেশ ধুমধাম করেই বিয়ে হয় তার। ছয় মাস আগে তার কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে কন্যা সন্তান। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের জাতিগত নিধনের অভিযানে সায়মার সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। সুখ শান্তি এক নিমিষেই মিলিয়ে যায় কর্পুরের ন্যায়।

প্রথমে কোন বিষয়েই কথা বলতে চায়নি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলাধীন হোয়াইক্যাং এলাকার তিন মাইল দক্ষিণে রৈখং দক্ষিণ পাড়ার দুর্গম অঞ্চলে আশ্রয় নেয়া এই রোহিঙ্গার সুন্দরী। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তার যেন আতঙ্ক কাটছিলো না। সুন্দর মুখশ্রী তখন ভয়ে জড়োসরো। অনিশ্চিত ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে কোলের শিশুকে নিয়ে।

ক্ষুধার্ত শিশুকে কোলে জড়িয়ে নিয়ে বলে, ২০ সেপ্টেম্বর। দুপুরের খাবার খেয়ে স্বামীর সাথে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। শিশুটি বাবার কোলে শুয়ে আছে। পাশের ঘরে শ্বশুর-শ্বাশুরী। হঠাৎ চারিদিক গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই চারজন মগ (মিয়ানমার সেনা) ঘরে ঢোকে। স্বামী দেলোয়ার বিছানা থেকে উঠতেই দুইজন মগ তাকে গুলি করে। লুটিয়ে পড়ে চোকির ওপর। গুলির শব্দে শ্বশুর-শ্বাশুরী আমাদের ঘরে ঢুকতে যাবে, তখনই নির্বিচারে গুলি চালায় মগেরা। ঘটনার আকস্মিকতায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি। মাঝে জ্ঞান ফিরতেই দেখি নিজের উপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে একজন মগ। পাশে তিনজন দাঁড়িয়ে। আবারও সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি।

গলা ধরে আসে সায়মার। আর যেন বলতে পারছিল না। আমি যে তাকে প্রশ্ন করবো সে ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলি। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকি। চোখ মুছতে মুছতে আবারো বলতে শুরু করে সায়মা। মেয়ের কান্নায় সম্বিৎ ফিরে পাই। সারা শরীরে তখন অসহ্য যন্ত্রণা। হায়েনাদের হিংসার থাবায় ক্ষত-বিক্ষত সারা শরীর। সারা ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। সন্তানকে কোলে নিয়ে কোন রকমে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসি। সারা পাড়ায় কোন মানুষের সাড়াশব্দ নেই। কীভাবে, কার সাথে যে এখানে এলাম সেটা ঠিক বলতে পারবো না। এবার আর কান্না ধরে রাখতে পারেনা সায়মা। হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরণের সান্তনা দিতে হয় বা দেয়া যায় তা আমার জানা ছিল না।

আবারো নিস্তব্ধতা। নির্বাক দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। পলিথিনের ঘুপড়ির নীচে মাটিতে বসে পড়ে। মুখ লুকাতে চেষ্টা করে। আমি কী করবো? ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সান্তনার সুরে কিছু একটা বলতে যাবো, তখনই নীরবতা ভেঙ্গে সায়মা বলতে শুরু করে, এখানে এসে পাশের বাড়ির এক মেয়ের সাথে দেখা। ও কোন রকমে পালিয়ে এসেছে। পালানোর সময় সে নিজের রূপ ঢাকতে সাড়া শরীর ও মুখে কাঁদা মেখে কুৎসিত রূপ ধারণ করেছিল। ও বললো, আমাদের পাড়ার ১৭-১৮ জন মেয়েদের মগেরা ধরে নিয়ে গেছে। সবাই মোটামুটি সুন্দরী। তারা এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? তা কেউ বলতে পারে না।

এবারে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সায়মা বলে, সুন্দরী হওয়াটাই আমাদের জন্য কাল হলো। স্বামী মারা গেল অকালে, শ্বশুর-শ্বাশুরী বিভৎস মৃত্যু হলো। আর আমাকে বাকি জীবন বাঁচতে হবে পাশবিক নির্যাতনের দু:সহ স্মৃতি নিয়ে। অনেক মেয়ে আছে যারা ততটা সুন্দরী না তাদের মগদের দৃষ্টি ছিল না। এবারে পাল্টা প্রশ্ন সায়মার, সুন্দরী হওয়াটা অপরাধ? আমরা তো আর দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি বুঝি না। সংসারের সামান্য সুখটুকু চেয়েছিলাম। বিনিময়ে যা পেলাম তা কী আর এ জীবনে ভুলতে পারবো কখনো?


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top