Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ , সময়- ১০:০৯ পূর্বাহ্ন
Total Visitor:
শিরোনাম

জামালপুরের সানন্দবাড়ির ‘অগ্রদূত ছাত্রসংঘ’এর মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় ভুমিকা  


কামরুন্নাহার শাপলা

আপডেট সময়: ১৪ নভেম্বর ২০১৭ ৯:১০ পিএম:
জামালপুরের সানন্দবাড়ির ‘অগ্রদূত ছাত্রসংঘ’এর মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় ভুমিকা  

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবন্দী, তখন সারা দেশের মতো যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার সানন্দবাড়ি বাজার ও সানন্দবাড়ি হাইস্কুলকে কেন্দ্র করে মহান গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র আন্দোলনের ঢেউয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো সমগ্র সান্দবাড়ি এলাকা। ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার দেওয়ানগঞ্জ থানা ও রংপুর জেলার গোবিন্দগঞ্জ মহকুমার ফুলছড়ি থানা ও আশেপাশের থানার চরাঞ্চলের অনেকেই জায়গীর থেকে পড়তেন সানন্দবাড়ি হাইস্কুলে। সানন্দবাড়ির এই ছাত্র আন্দোলনের সংগ্রামে সানন্দবাড়ি হাইস্কুলের ছাত্ররা ছাড়াও জড়িত হন প্রাক্তন ছাত্ররা যারা বিভিন্ন কলেজে পড়তেন, এবং, ওনারা ছাড়াও জড়িত হয়েছিলেন এলাকার কৃষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ি, শিক্ষক সহ সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু এ আন্দোলনের সংগঠকের দায়িত্বটি ছিলো মূলত: এই এলাকার বাসিন্দা কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের হাতে। এদের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এলাকার উন্নয়ন এবং এলাকায় সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া চর্চার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো বলে এলাকার প্রবীণদের কাছে জানা যায়। 

আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রীদের দাপট ও হুমকীর মুখে যখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড পরিচালনায় সাহস পাচ্ছিলেন না, ছাত্রলীগ নাম নিয়ে যখন কোন সংগঠন করা যাচ্ছিলো না, তখন ভিন্ন কৌশলের উদ্যোগ নেন এলাকার সাহসী এক তরুণ। ১৯৬৯ সালে তরুণ ছাত্র জনাব শেখ আব্দুল কাদের এর নেতৃত্বে সানন্দবাড়ী এবং এর আশপাশের কিছু এলাকার মুক্তমনা মানুষ ও এসএসসি (মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় পঁচিশ জন মেধাবী ছাত্র নিয়ে, জনাব আব্দুস ছামাদ আকন্দকে সভাপতি করে গঠিত হয় “অগ্রদূত ছাত্র সংঘ”। এই সংঘটির সদস্য পদ পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা ছিল যে, এই এলাকার যে কেউ এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হলেই, সে আপনাআপনি এই সংঘের সদস্য হয়ে যেত। এই সংঘের অধিকাংশ সদস্যই ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং উদার সংস্কৃতমনা, এরা এলাকার আধুনিকায়নে নানা ধরনের উন্নয়নমুলক কাজ করত এবং নাটক, থিয়েটার, মঞ্চাভিনয় ও বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রামাণ্য নাটিকায় অভিনয় করে এলাকার অশিক্ষিত মানুষদের সচেতন করতে। এই সংঘটির কাজ ছিল মুলত: “মন্দকে না বলা এবং ভালোর সঙ্গে চলা” অর্থাৎ ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’, ‘যেখানেই অন্যায়, সেখানেই প্রতিরোধ’ এবং নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে এলাকার উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে পড়া। একই সঙ্গে এরাই গণঅভ্যুত্থানে এ এলাকায় নেতৃত্ব দেন ও ১৯৭০ এর সাধারন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মনোনীত এমএনএ ও এমপিএ প্রার্থীদের পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশনায় প্রচারণার কাজ করেন। উল্লেখ্য যে, শেখ জনাব আব্দুল কাদের প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রতিষ্ঠিত ভুয়াপুর কলেজ হতে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ডিগ্রীতে ভর্তি হন ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে, ওখানে তিনি প্রভাবিত হন ও স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন “বঙ্গবন্ধুর তোফায়েল আহমেদ” এর সুযোগ্য উত্তরসুরি নাসিরাবাদ কলেজের তরুণ প্রভাষক মো: মতিউর রহমান (বর্তমান মাননীয় ধর্ম মন্ত্রী অধ্যক্ষ মো: মতিউর রহমান) এর মাধ্যমে। 

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ঐ অঞ্চলের সমস্ত মৌলিক গণতন্ত্রী ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিপক্ষে যেয়ে উক্ত সঙ্ঘটির সদস্যবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করে এবং প্রত্যেক হাটের দিন তাঁরা হাটুরে জনগণের থেকে টাকা-পয়সা সংগ্রহ করে তা মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ১১ নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার হাতে তুলে দিতেন, উনি এই টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা সহ বিভিন্ন প্রকার কল্যাণে ব্যয় করতেন। উল্লেখ্য যে, অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া বহুবার শেখ আব্দুল কাদেরের বাড়িতে এসে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় রণকৌশল, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন বাড়িতে নিরাপদে রাখা এবং পাকবাহিনী ও রাজাকারদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নিতেন, পরামর্শ করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে কি কি ধরনের রসদের দরকার তা জানিয়ে যেতেন। সানন্দবাড়ী এবং এর আশপাশের এলাকাসমুহ মুক্তাঞ্চল থাকার কারনে, সংগঠনটি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে তাদের খাবার, টাকা-পয়সা, কাপড়চোপড় দিয়ে সহায়তা করতেন। এছাড়াও অগ্রদূত ছাত্র সংঘ এর সাধারন সম্পাদক তৎকালীন সময়ের ঔষধ ব্যবসায়ি ও কলেজ ছাত্র শেখ আব্দুল কাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা রাজিবপুর, রৌমারী, কামালপুর সহ বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ঔষধ,  খাদ্য সামগ্রী সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস স্বশরীরে বয়ে নিয়ে দিয়ে আসতেন। এই সময় শেখ আব্দুল কাদের নিজের টাকায় ব্যক্তিগত ভাবে কমপক্ষে দশ হাজার টাকার ঔষধ মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। এভাবেই উক্ত সঙ্ঘটি এবং জনাব শেখ আব্দুল কাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করে মহান স্বাধীনতা অর্জনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ নয়মাসের অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জাতির পিতা’ হয়ে ওঠার পেছনে জাতীয় ইতিহাসের এলাকায় সানন্দবাড়ির এই বীরদের অবদান সামান্য হলেও উপেক্ষা করার মতো নয়, এমন ছোট ছোট বীরত্বগুলির মাধ্যমেই তো আমাদের বিশাল গণমানুষের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

জাতির পিতার স্বপরিবারে নির্মমভাবে খুন হওয়ার পর হতে ১৯৯০ সালের ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত সামরিক জান্তাদের দমন-পীড়নের মুখে শেখ আব্দুল কাদের ও হাতে গোনা কিছু লোক বাদে “জয় বাংলা” বলার লোক খুঁজে পাওয়া যেত না সানন্দবাড়িতে। ঐ দূর্দিনের নৌকার কান্ডারি ও ত্যাগী নেতারা আজ হারিয়ে গেছেন, অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত, লোভী হাইব্রিড আওয়ামী লীগারদের স্রোতে। 

উক্ত সঙ্ঘটির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে ১৯৭৪ সালে জনাব শেখ আব্দুল কাদের অব্যাহতি নিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের অভাবে ঐ বছরই সংঘটি ভেঙে যায়। সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ কয়েক জন সদস্যের নাম এখনো মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়, যারা এলাকার উন্নয়নে, মহান গণঅভ্যুত্থানে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জল ভুমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: সভাপতি- জনাব আব্দুস সামাদ আকন্দ, সাধারন সম্পাদক- জনাব শেখ আব্দুল কাদের (সাবেক ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান), সদস্যবৃন্দ- সর্বজনাব সৈয়দ জামান সিকদার, আব্দুল গফুর মাষ্টার, আব্দুল করিম আকন্দ (কেরানী), আব্দুল কাদের মন্ডল, আব্দুল মজিদ মন্ডল (সাবেক মেম্বার), আব্দুর রাজ্জাক (ফরমান আলী), আব্দুল কাশেম (অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব), হাবিবুর রহমান (ডিলার), হাবিবুর রহমান মাষ্টার,  আব্দুস সালাম মন্ডল, ওসমান গনি, আব্দুল মতিন (চর মাদার) প্রমূখ। এদের অনেকেই এখন আর নেই, বয়সের ভারে প্রকৃতির নিয়মে চলে গেছেন পরপারে, যারা বেঁচে আছেন, তারাও বার্ধক্যে জ্বরাগ্রস্ত।

এসব মহান ব্যক্তিদের জীবনী এবং দেশমাতৃকার মুক্তিতে ও এলাকার উন্নয়নে তাদের অবদানকে সংগ্রহ করে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বরাবরে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছেন এলাকার বিবেকবান মানুষেরা।


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top