Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ , সময়- ৩:০০ অপরাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
মুসল্লিরা জায়নামাজ ও ছাতা ছাড়া অন্য কিছু নিতে পারবেন না : ডিএমপি কমিশনার দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে জামাতের সময়সূচী  ব্রাজিলের সাপোর্টার প্রধানমন্ত্রী, একই দলের সমর্থক জয় মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করতেই ইসরাইলের সৃষ্টি নূর চৌধুরী'কে দেশে ফেরাতে কানাডার আদালতে মামলা করেছে সরকার নির্বাচনী কৌশলগত কারনেই জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ছে বিএনপি বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে ৫-০ ব্যবধানে জয় পেল স্বাগতিক রাশিয়া বাগেরহাট ৩ আসনের উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি'র শপথগ্রহণ ঘরমুখো মানুষ, চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন ট্রেনের যাত্রীরা

এক শতকের বিবর্তনে পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম সমাজ


ড. সা’দত হুসাইন

আপডেট সময়: ২ জুন ২০১৮ ৩:৪৮ পিএম:
 এক শতকের বিবর্তনে পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম সমাজ

উপ-সম্পাদকীয় : ষাটের দশকের প্রথম দিকে আমরা যখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন আমাদের চারপাশে যেসব ছাত্র-শিক্ষককে দেখতে পেয়েছি, তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। আমার ধারণা, ভিন্ন ধর্মের ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হবে না। ছাত্রদের চেয়ে শিক্ষকের অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। বাস্তব অবস্থার তোড়ে তখন জানার ইচ্ছা হয়নি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে কিংবা ত্রিশের দশকে অথবা চল্লিশের মাঝামাঝি সময়ে দেশ বিভক্তির আগে মুসলমান ছাত্র-শিক্ষকের এরূপ প্রাধান্য ছিল কি না। 

পাকিস্তানের বয়স তখন এক যুগ পেরিয়েছে। দেশে তখন চলছে আইয়ুব-মোনেমের শাসন। এত দিনে মুসলিম প্রাধান্য এমন গেড়ে বসেছে যে সাধারণ নাগরিকদের কাছে ধর্মভিত্তিক বৈষম্য সংক্ষুব্ধ হওয়ার মতো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। ছাত্ররাজনীতির সক্রিয় সদস্য হিসেবে শিক্ষাঙ্গনের বাইরের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আমরা বিস্তর আলাপ-আলোচনা, তর্কবিতর্ক করেছি; মিছিলে, সভায় স্লোগান দিয়েছি। কিন্তু ধর্মভিত্তিক বৈষম্য আমাদের আলাপ-আলোচনা বা কর্মসূচিতে স্থান পেয়েছে বলে মনে হয় না।

ষাটের দশকের শেষভাগে সিভিল সার্ভিসের সদস্য হওয়ার কারণে সাবেক সিএসপি অফিসারদের জীবনবৃত্তান্ত ও পারিবারিক পরিচয় জানার ব্যাপারে আমার একটু বাড়তি আগ্রহ ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার আগে-পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এই সার্ভিসের কর্মকর্তারা সরকারের সুউচ্চ পদের একটা বিরাট অংশ দখল করেছিলেন। সামাজিক মর্যাদার দিক থেকেও তাঁদের অবস্থান ছিল অনেক ওপরে। তাঁদের মেধা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সর্বজন স্বীকৃত। তাঁদের প্রায় সবাই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। চাকরিতে যোগদানের সময় দু-একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী থাকলেও যোগদানের কয়েক বছরের মধ্যে তাঁরা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে নেন। ফলত সব দিক থেকে তাঁদেরকে সমাজের উঁচু স্তরের সদস্য হিসেবে গণ্য করা যায়। আমি কোনো আনুষ্ঠানিক জরিপ চালাইনি। তবে চোখ বোলানো জরিপ (Casual Epiricism) করে দেখতে পেয়েছি যে তাঁদের বেশির ভাগের বাবা ছিলেন ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস, আন্ডার গ্র্যাজুয়েট। কাউকে কাউকে ম্যাট্রিক প্লাস বলা যায়। তাঁরা ম্যাট্রিক পাসের পর বিভিন্ন পেশার নির্ধারিত পরীক্ষা পাস করে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অভিভাবকের (বাবা) সংখ্যা খুব কম, হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র।

সিএসপি অফিসারদের অভিভাবকের (বাবা) শিক্ষা-দীক্ষার খোঁজ নিতে গিয়ে পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের শিক্ষার্জন ও অর্থনৈতিক অবস্থার ক্ষেত্রে গত এক শতকে যে বিবর্তন ঘটেছে, তার সম্পর্কে একটা আবছা ধারণা পেলাম। এ ব্যাপারে বই আকারে প্রকাশিত সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে অধ্যাপক রাজ্জাকের আলাপচারিতা বিশেষ সহায়ক হয়েছে। বইটি বেশ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত হলেও আমার হাতে এসেছে দেরিতে। বইটি পড়ে গত শতকের প্রথম দিক থেকে, বিশেষ করে ত্রিশের দশক থেকে শতকের শেষ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্রম আরোহণের বৃত্তান্ত অনেকটা পরিষ্কারভাবে জানা সম্ভব হয়েছে।

অধ্যাপক রাজ্জাকের জন্ম ১৯১৪ সালে; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৬৮ বছর পর। অধ্যাপক রাজ্জাকের বাড়ি কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া গ্রামে। তখনকার দিনে এটি ছিল প্রত্যন্ত গ্রাম। স্থলপথে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। নদীপথ ছিল যাতায়াতের একমাত্র উপায়। গ্রামের স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ঢাকা কলেজ হয়ে রাজ্জাক সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১৯৩১ সালে। আলাপচারিতায় এ সময়ের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের অর্থনৈতিক, শিক্ষাসংক্রান্ত ও সামাজিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর মতে, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় শিক্ষিত মুসলমানদের সংখ্যা একেবারে নগণ্য ছিল না। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ইংরেজরা মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। ভালো মাইনের চাকরিতে তাদের নিয়োগ কমিয়ে পর্যায়ক্রমে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়। পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষা পেতে হলে কলকাতায় যেতে হতো। কলকাতায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। গুটিকয়েক সম্ভ্রান্ত-সচ্ছল পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব ছিল। তাদের যোগ্য ও আগ্রহী ছেলে-মেয়েরাই শুধু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তখন অতি নগণ্যসংখ্যক, কয়েকজন মাত্র মুসলমান ছাত্র এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায় সবাই ছিলেন অমুসলিম। তাঁদের অনেককেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেকে আনা হয়েছিল। বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাঁদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরি দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা এবং সরকারি চাকরি থেকে প্রেষণে আসা কয়েকজন ইংরেজ মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামো গড়ে তোলেন। শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে এসব শিক্ষকের নিষ্ঠা, উদ্যোগ ও নৈতিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। তাঁদের বেতন সেই বিশ-ত্রিশের দশকেও অতিমাত্রায় লোভনীয় ছিল। যেমন একজন অধ্যাপকের মাইনা ছিল মাসিক এক হাজার টাকা। পক্ষান্তরে একই সময়ে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মাইনা ছিল মাসিক আট টাকা মাত্র। মুসলমান শিক্ষক মাত্র কয়েকজন। তাঁরা মূলত ইসলামিক স্টাডিজকেন্দ্রিক বিষয়ে অধ্যাপনা করতেন। মুসলিম অধ্যাপকদের মধ্যে স্যার এফ রহমান ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। মাধ্যমিক স্কুলে অবশ্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমান শিক্ষক ছিলেন। যেমন ঢাকা মুসলিম হাই স্কুলে মাত্র একজন হিন্দু শিক্ষক ছাড়া বাকি সব শিক্ষক ছিলেন মুসলমান।

বিশের দশকে একেবারে হাতে গোনা দু-একজন ছাত্র ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। ত্রিশের দশকে এসে এ সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মুসলমান ছাত্ররা পরবর্তীকালে প্রায় সবাই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রসিদ্ধ হয়েছিল। যেমন বিশের দশকে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্র হাফিজুর রহমান পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। আলতাফ হোসেন পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত ডন পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। বাচ্চু মিঞার (আবদুল ওহাব মিঞা) ছোট ভাই গেদু মিঞা কলকাতা পুলিশের বড় কর্মকর্তা হয়ে নাম-সুনাম অর্জন করেছিলেন। ইংরেজিতে আরো ফার্স্ট ক্লাস পান আবু মুসা শরফুদ্দিন, যিনি পরবর্তীকালে পুলিশপ্রধান এবং পূর্ব পাকিস্তানের অতিরিক্ত চিফ সেক্রেটারি হয়েছিলেন এবং ফজলুর রহমান, যিনি পূর্ব পাকিস্তানের ডিপিআই ও সেন্ট্রাল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হয়েছিলেন। ইকোনমিকসে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলেন এম এন হুদা ও আতোয়ার হোসেন। এম এন হুদা স্বল্প সময়ের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। কয়েক বছর তিনি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। আতোয়ার হোসেন পূর্ব পাকিস্তান প্ল্যানিং বোর্ড ও সেন্ট্রাল প্ল্যানিং বোর্ডের সদস্য হয়েছিলেন।

উপমহাদেশ বিভক্তির আগ পর্যন্ত শিক্ষার স্তরে মুসলিম ছাত্রের সংখ্যানুপাতিক হারের বড় একটা পরিবর্তন হয়নি। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। পাকিস্তান ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুসলমানদের উন্নয়ন ও স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসকরা দেশ শাসন শুরু করেন। পাকিস্তানের দুটি অংশ, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান ছিল ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এক অংশ ভারতের পূর্ব সীমান্তে, অপর অংশ এক হাজার ২০০ মাইল দূরে, ভারতের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী হলেও শাসনক্ষমতা ছিল সম্পূর্ণরূপে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। দেশের রাজধানী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, প্রথমে করাচিতে, পরে ইসলামাবাদে। নানারূপ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রথম দিকে প্রতিবাদ করে, পরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। একসময় তাদের ওপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। বর্বর আক্রমণের মুখে মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। সৃষ্টি হয় একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।

এত বঞ্চনা-বৈষম্য সত্ত্বেও বাস্তবতা তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়। ১৯৪৭ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা তীব্র বেগে বাড়তে থাকে। সারা পাকিস্তানে প্রতিযোগিতামূলক যে মর্যাদাবান সেন্ট্রাল সুপরিয়র সার্ভিস (সিএসএস) পরীক্ষার মাধ্যমে শীর্ষ ক্যাডারগুলোতে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হতো, সেই পরীক্ষায় পূর্ব পাকিস্তানের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী যুবকরা অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের অনেকেই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শীর্ষ ক্যাডারগুলোতে যোগদান করেন। মফস্বল শহরের খুদে চাকরিজীবী, গ্রামের সচ্ছল কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্কুল মাস্টার—তাঁদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে থাকেন। সচ্ছল হিন্দু পরিবারের বেশির ভাগ ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। ফলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তীচ্ছুক মুসলমান ছাত্ররা সহজেই স্থান পেয়ে যায়। এ অঞ্চলের লোকেরা অনুকরণ-অনুসরণ করতে পছন্দ করে। এক পরিবারের দেখাদেখি অন্য পরিবার তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার্থে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মুসলমান ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালে প্রদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এতে উচ্চশিক্ষার পথ আরো প্রশস্ত হয়। পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম সমাজে শিক্ষার ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা হয়।

পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act., hv EBSATA হিসেবে বেশি পরিচিত। রাজা-মহারাজার সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকলেও পূর্ববঙ্গেও জমিদারি প্রথা চালু ছিল। সে হিসেবে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি ছিল সামন্ততান্ত্রিক। এই প্রথায় নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির সামাজিক ও অর্থনৈতিক আরোহণের (Mobility) পথ থাকে অতীব সংকীর্ণ এবং বন্ধুর। এ পথ বেয়ে ওপরে ওঠা নিচের স্তরের মানুষের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। জমিদার কর্তৃক তাদের জীবনযাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। এর ফলে তাদের উচ্চাশা ও উদ্যোগ, যা ওপরে ওঠার প্রধান শক্তি, অঙ্কুরে বিনষ্ট হতো। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর জমিদারদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা শিথিল হতে হতে অবশেষে বিলীন হয়ে যায়। মুক্ত পরিবেশে পূর্ববঙ্গের প্রজারা, যাদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ছিল মুসলমান, নিজেদের মতো করে চলাফেরা ও ভাগ্য গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ তাদের স্বপ্নের সীমারেখা টেনে দিলেও এই সীমারেখার মধ্যে তারা ধীরগতিতে এগোতে থাকে।

এ সময় কেন্দ্রীয় সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ করে, যার লক্ষ্যবদ্ধ উপকারভোগী ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ। এতৎসত্ত্বেও স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে উপকারের ছিটেফোঁটা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর বর্ষিত হয়। উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা কলম্বো প্ল্যান, কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, ইউএসএআইডির অনুদান ইত্যাদি নানা রকম কর্মসূচির অধীনে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেন। তাঁরা বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, মাস্টার্স, এমআরসিপি, এফআরসিএস, এলএলএম, বার এট-ল, সিএ ইত্যাদি ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং সুপ্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হিসেবে সমাজে স্থান করে নেন। কিশোর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নানারূপ ছাত্রবৃত্তি প্রচলন করা হয়। নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্ররা এসব বৃত্তির মাধ্যমে প্রভূত উপকার ভোগ করেন। পরিবারের সরাসরি আর্থিক সমর্থন ছাড়া তাঁরা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে সমর্থ হন। পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে তাঁরা উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সমাজে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন। সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে কর্মক্ষম অবস্থায় থেকে তাঁদের অনেকে এখনো দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রেখে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁদের সন্তান-সন্ততি দেশ-বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন পেশায় ও স্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বলা বাহুল্য, তাঁদের বেশির ভাগই মুসলমান।

স্বাধীনতা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সবচেয়ে বড় অর্জন। এর মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম স্বতন্ত্র দেশ পেয়েছি। নিজস্ব পতাকা পেয়েছি। এ গৌরব বর্ণনার অতীত। কোনো গৌরবগাথা এর জন্য যথেষ্ট নয়। তবু এ কথা সত্য যে স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছরে নানারূপ সমস্যা ও কষ্টকর অবস্থার মধ্যে আমাদের দিন কাটাতে হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে।

প্রথম দিকে কিছুটা ঘোরের মধ্যে থাকলেও বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাতে কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের জনগণ বুঝতে পারে যে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে শুধু দেশের সীমারেখায় সুযোগ-সুবিধা, সহায়সম্পদ খুঁজলে চলবে না। সম্পদের খোঁজে, ভাগ্যের অন্বেষণে তাঁদের সীমান্ত পেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে হবে। পাকিস্তান আমলে একটি বঞ্চিত ও নিষ্পেষিত এলাকার অধিবাসী হিসেবে এ ধরনের চিন্তা মাথায় আসার কথা নয়। এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়-উপার্জন দেশের সমৃদ্ধি বাড়াচ্ছে। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকরাও পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে। বিদেশ থেকে আসা আমদানি সামগ্রী, বৈদেশিক মুদ্রার স্ফীত রিজার্ভ ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসা বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। মানুষের ভোগসম্ভার অনেক বেড়েছে।

দেশের ভেতরে অবস্থানকারী কৃষক, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা গোষ্ঠী বুঝতে পেরেছে যে আদিকালের প্রযুক্তিপদ্ধতি ব্যবহার করে বেশি দূর এগোনো যাবে না। নতুন প্রযুক্তি চাই; উন্নত প্রযুক্তি চাই। নিষ্ঠা, শ্রম ও একাগ্রতা নিয়ে চেষ্টা করলে তা পাওয়া যায়। বাংলাদেশিরাও তা পেয়ে গেল। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে অন্যান্য উৎপাদন গেল বেড়ে। সরকারকে বেশি না জড়িয়ে নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করল। এখন তাদের মূল সংশয় হচ্ছে সরকারি প্রশাসন যেন আইনি প্যাঁচে ফেলে তাদের আহত না করে।

পূর্ববঙ্গীয় (বাংলাদেশি) মুসলিম সমাজ এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ, অনেক বেশি শিক্ষিত, অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। দেশের জনসংখ্যায় মুসলমানদের অনুপাত প্রায় আগের মতোই। হতে পারে আনুপাতিক হার সামান্য বেড়েছে। স্বাধীনতার প্রথমভাগে চাকরিবাকরিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নগণ্য ছিল। এখন বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মুসলমানদের অবস্থার বিশেষ হেরফের হয়নি। তবে এক শ্রেণির লোকের মধ্যে হালকা ক্ষোভ রয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম সমাজ শিক্ষা-দীক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে গত এক শতকে অনেক দূর এগিয়েছে। তাদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জীবনযাপন সুখকর এবং মসৃণ হয়েছে কি না সে সম্পর্কে সুনিশ্চিত ও অবিসংবাদিতভাবে কিছু বলা মুশকিল।


লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top